বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আলু চাষ হয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকেই স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এখানকার আলু ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ভালো দাম পাওয়ায় লাভের মুখ দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এতে খুশি আড়তদার ও রপ্তানিকারকরাও।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শিবগঞ্জে প্রায় ১৮ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে এর চেয়েও বেশি জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। উফশী জাতের আলুর মধ্যে মিউজিকা, ডায়মন্ড, গ্র্যানুলা, অ্যাসটিক, কার্ডিনাল, রোজেটা ও ক্যারেজ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি নতুন জাত ১২/১৩ এবং লাল পাকড়ী জাতের মধ্যে তেলপাকড়ি, পাহাড়িপাকড়ি, বটপাকড়ি ও ফাটাপাকড়ির চাষও হয়েছে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় রপ্তানিকারকরা মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ শুরু করেন। ফলে মাঠ থেকেই আলু বিক্রি করতে পেরে স্বস্তিতে রয়েছেন চাষিরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খেতে খেতে আলু উত্তোলনের কাজ সবে শুরু হয়েছে। বাজারে চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জমজমাটভাবে আলু বেচাকেনা চলছে।
ভাগকোলা গ্রামের কৃষক মোত্তালিব হোসেন, রহুল আমিন ও খালিদ মিয়া জানান, এবার প্রতি বিঘায় আলু চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ফলন পাওয়া গেছে প্রায় ৯০ মণ। সব খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। তাঁরা বলেন, “প্রতি বছর যদি এমন দাম থাকে, তাহলে আলুর আবাদ আরও বাড়বে।”
একই গ্রামের আরেক কৃষক বলেন, “আমার জমির সব আলু মালয়েশিয়ার ফার্মাস এগ্রো লিমিটেডের কাছে মণপ্রতি ৫২০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। লাভও ভালো হয়েছে। আমার খেতের আলু বিদেশে যাচ্ছে—এটা ভেবে গর্ব লাগে।”
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মাসওয়া এগ্রো কোম্পানির বগুড়া প্রতিনিধি ও শিবগঞ্জের মেসার্স সাগর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সাগর হোসেন জানান, তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে উন্নতমানের আলু সংগ্রহ করে তারা বিদেশে রপ্তানি করছেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আলুর মান ভালো। গত বছর শুধু মালয়েশিয়ায় ৭৫ টন আলু রপ্তানি করা হয়েছে। এবার ১০০ টনেরও বেশি পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে।”
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিতোশ চন্দ্র রায় বলেন, “শিবগঞ্জের মাটি খুবই উর্বর, আবহাওয়াও অনুকূলে থাকে এবং এলাকায় বন্যার ঝুঁকি কম। ফলে আলুসহ যেকোনো ফসলের ফলন ভালো হয়। এবার টানা বর্ষা না হওয়ায় বীজতলাও নিরাপদ ছিল, যার কারণে বাম্পার ফলন পাওয়া গেছে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ মোট ৩০টি দেশে প্রায় ৭৮ হাজার টন আলু এবং ১ লাখ ৬ হাজার ২৬২ টন সবজি রপ্তানি হয়েছে। চলতি মৌসুমে রাশিয়াতেও আলু রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান প্রতিদিনের সংবাদ কে বলেন, “শিবগঞ্জ কৃষি বিপ্লব ও শস্যভাণ্ডারের এলাকা। এখানকার মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং সব ধরনের ফসলের জন্য উপযোগী। কয়েক বছর ধরেই এখান থেকে বিদেশে আলু রপ্তানি হচ্ছে, এতে কৃষকেরা উপকৃত হচ্ছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবারও আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।” (প্রতিদিনের সংবাদ)
