কেবল কৃষি প্রেম নয়, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেও এগিয়ে এসেছেন এক স্বপ্নবান মানুষ। সুবিধাবঞ্চিত কিছু শিক্ষার্থীর পড়ালেখার খরচ জোগাতে জন্ম নেয় একটি বরই বাগান। যা এখন শুধু আয় নয়, আশারও উৎস। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের বাউরভাগ গ্রামে সেই বরই বাগানটি গড়ে তুলেছেন কৃষি উদ্যোক্তা আবুল ফজল তালুকদার।
কথায় আছে, ‘আমার দেশের মাটি, সোনার চেয়েও খাঁটি’। আর এই মাটি সৎ পরিশ্রমের মূল্য দেয়। তালুকদার অ্যাগ্রো নামের এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছে থাকলে দেশের মাটিতেই গড়া যায় সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ। সম্প্রতি বরই বাগানে গিয়ে দেখা যায়, গোল সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে, ডালে ডালে ঝুলছে ছোট-বড় অনেক বরই। কোনোটি সবুজ, কোনোটি লাল, কোনোটিতে হলদে রং ধরেছে।
এই কৃষি উদ্যোক্তা বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার। আলাপকালে ঢাকা মেইলকে তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি তার টান ছিল। সুযোগ পেলেই ফসলের কাছে ছুটে যেতেন। চাকরি অবস্থায় আলাদা করে সময় বের করা বেশ মুশকিল ছিল। তবে মাথা থেকে কৃষির ভাবনা হারায়নি। সুবিধাবঞ্চিত কয়েকজন শিক্ষার্থীকে তিনি ও তার স্ত্রী শিক্ষিকা তালুকদার আমেনা ফজল পড়ালেখা করান। কিন্তু, দুইজনের আয়ে এই শিক্ষার্থীর এই বাড়তি খরচ জোগাতে বেশ হিমশিম খেতে হয় তাদের। প্রথমে ভেবেছিলেন এই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খরচ জোগাতে কিছু টাকা ব্যাংকে রেখে দেবেন। তা থেকে যা লাভ আসবে, তাই দিয়ে ওদের পড়ালেখা করানো হবে। পরে এই কৃষি প্রেমীর বরই বাগান করার আগ্রহ তৈরি হয়।
আবুল ফজল বলেন, বর্তমানে চারজন শিক্ষার্থী আমাদের কাছে পাঁচ-আট বছর ধরে আছে। একজনকে বিয়ে দিয়েছি। তাদের লেখাপড়া চালানোর পাশাপাশি চিকিৎসাসহ যাবতীয় খরচ এখন এই বাগানের আয় চলছে। ২০১৯ সালে ৩ কিয়ার জমিতে ৫০০ চারা দিয়ে বরই বাগানে বরই চাষ শুরু করেন এই কৃষি উদ্যোক্তা। পর্যায়ক্রমে প্রায় ১২ কিয়ার জমিতে চারটি বরই বাগান গড়ে তুলেছেন। এখন বাগানে প্রায় ৩ হাজার বরই গাছ রয়েছে। এতে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। তবে বিনিয়োগের এই টাকা উঠে এসেছে। এখন বাগানের আয়েই বাগানের খরচ চলছে। চারজন নিয়মিত শ্রমিক আছেন। তার বরই বাগানে থাই কুল, কাশ্মীরি আপেল কুল, বল সুন্দরী, চায়না টক-মিষ্টি, নারকেল কুল, জাম্বু কুল ও ঢাকা-৯০ জাতের বরই আছে। সব জাত একসঙ্গে পাকে না। পর্যায়ক্রমে একেকটি জাত পাকবে। তার বাগানে কোনো রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করেন না। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বরই বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিকেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার কেজি বরই বিক্রি হয়েছে। আরও ১০-১৫ হাজার কেজি বরই বিক্রির আশা করছেন তিনি। এখানে পাইকারি বা বাজার ব্যবস্থাপনায় বরই বিক্রি করা হয় না। পরিচিত-অপরিচিতরা বাগান দেখতে আসেন, নিজের হাতে বরই পেড়ে খান ও বাগান থেকেই ফল কিনে নিয়ে যান। এই বাগানের আয় দিয়েই এখন সুবিধাবঞ্চিত কিছু শিক্ষার্থীর পড়ালেখার খরচ চালানো হয়। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন সামিয়া আক্তার। বিএ পাস করে এখন আইসিটি কোর্স করছেন। তিনি বলেন, নবম শ্রেণি থেকে আমার মামা আবুল ফজল আমি ছাড়াও আরও তিনজনের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। মামা চাকরি করে উনার সন্তানসহ আমাদের পড়ালেখার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে এই বাগান গড়ে তোলেন। এখন বাগানের আয় দিয়েই আমাদের পড়ালেখার খরচ চলছে।
তিনি আরও জানান, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রফিনগরে আবুল ফজলের গ্রামের বাড়ি। সেখানকার কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর বেতন, বই খাতার খরচের জোগান দেওয়া হয় এই বাগানের আয় থেকে। পাশাপাশি সেখানে ফুটবল খেলা হয়। খেলোয়াড়দের জার্সি, পুরস্কার প্রদানসহ যাবতীয় খরচও বাগান থেকে দেওয়া হয়।
আবুল ফজল বলেন, ২০২৫ সালে চাকরি থেকে অবসরে যাই। আমি এখন পুরোপুরি চাষি। সিলেট অঞ্চলের বেকার ছেলেমেয়েদের জন্য একটি বার্তা দিতে চাই, বিদেশে গিয়ে কষ্টের জীবন নয়, দেশে থেকেই সৎভাবে চাষাবাদ করে ভালোভাবে বেঁচে থাকা যায়। কথায় আছে 'আমার দেশের মাটি, সোনার চেয়েও খাঁটি'। আমার বিশ্বাস, এই মাটি সৎ পরিশ্রমের মূল্য দেয়, মাটি কখনও বেইমানি করে না।
- ঢাকামেইল এর সৌজন্যে
