ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার

জ্বালানি সংকট, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: নীতিনির্ধারণে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি



সম্পাদকীয়

প্রফেসর ড. মোঃ আসাদুজ্জামান সরকার

(১০ ঘন্টা আগে) ১৮ এপ্রিল ২০২৬, শনিবার, ৮:৫১ অপরাহ্ন

agribarta

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো কৃষি। দেশের সার্বিক উন্নয়ন অভিযাত্রায় এই খাত এখনো প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট সেই মজবুত স্তম্ভে আঘাত হানছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে সৃষ্ট এই চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের কৃষিজ উৎপাদন ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
প্রথমত, জ্বালানি সংকটের কারণে সেচব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের একটি বিশাল অংশের কৃষি জমি এখনো ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট সেচযন্ত্রের সিংহভাগই ডিজেলচালিত। ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পর্যাপ্ত পানি না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ফসলি জমি ফেটে চৌচির হচ্ছে, যা সরাসরি ফলন কমিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা ‘লোডশেডিং’-এর কারণে বৈদ্যুতিক সেচ পাম্পগুলোও নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এই দ্বিমুখী সংকট কৃষকের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত, তীব্র গ্যাস সংকট সার উৎপাদনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বাংলাদেশের সার কারখানাগুলোতে ইউরিয়া সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়। গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমে যাচ্ছে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানিকৃত সারের দামও চড়া। সময়মতো এবং সুলভ মূল্যে সারের জোগান নিশ্চিত না হলে ফসলের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়া অনিবার্য, যা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনকে স্থবির করে দিতে পারে।
তৃতীয়ত, আধুনিক কৃষির যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়া জ্বালানি সংকটে স্থবির হয়ে পড়ছে। কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার এবং কম্বাইন হারভেস্টারের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেলের উচ্চমূল্য কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছে। শ্রমিকের উচ্চমূল্যের এই সময়ে যান্ত্রিকীকরণে বাধা আসার অর্থ হলো চাষাবাদে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যাওয়া। এটি দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদনশীলতা হ্রাসের পাশাপাশি তরুণ সমাজকে কৃষি পেশায় বিমুখ করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এক গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মানেই বাজারে খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহ কমে যাওয়া, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে চাল, ডালসহ নিত্যপণ্যের মূল্যের ওপর। এতে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষ পুষ্টিহীনতা ও খাদ্য সংকটে পড়ার উচ্চ শঙ্কা তৈরি হয়। এছাড়া, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমলে ঘাটতি মেটাতে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল ও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। তাই কৃষিতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এ অবস্থায় সরকারের করণীয় কী?
প্রথমত, জ্বালানি খাতে আমূল ও দ্রুত সংস্কার এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস, বিশেষ করে সৌরশক্তির ব্যবহার গ্রামীণ কৃষি কাঠামোতে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে হবে। সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপনের মাধ্যমে কৃষকরা দীর্ঘমেয়াদে সেচ খরচ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারেন। এটি শুধু ডিজেল বা বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাবে না, বরং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। এ লক্ষ্যে কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে সোলার পাম্প সরবরাহ এবং এর রক্ষণাবেক্ষণে কারিগরি সহায়তা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন সচল রাখতে লক্ষ্যভিত্তিক ও সরাসরি ভর্তুকি অব্যাহত রাখা জরুরি। বিশেষ করে বোরো মৌসুম বা আমন চাষের সময় ডিজেল, বিদ্যুৎ ও সারের ওপর ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য জামানতবিহীন কৃষিঋণ এবং বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করা দরকার। ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের কাছে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষক চাষাবাদে আগ্রহী হবে।
তৃতীয়ত, খাদ্য মজুদ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৈশ্বিক সংকটের কথা মাথায় রেখে সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্য মজুদের সক্ষমতা দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেটগুলো চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে আধুনিক বিপণন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষণা ও উচ্চ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ কয়েক গুণ বাড়াতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা এবং উত্তরাঞ্চলে খরা বাড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল স্বল্পমেয়াদী উচ্চফলনশীল জাতের ফসল উদ্ভাবন করতে হবে। একই সঙ্গে ন্যানো-ফার্টিলাইজার ও প্রিসিশন এগ্রিকালচারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি কৃষকদের নাগালে পৌঁছে দিতে পারলে অল্প খরচে অধিক ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সবশেষে, জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্য-এই তিন খাতকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি খাতের সংকট অন্যটিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। তাই একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত জাতীয় নীতির মাধ্যমে এই ত্রিমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। যদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে থমকে দিতে পারে।
বাংলাদেশ অতীতেও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ সাহসের সাথে মোকাবিলা করেছে। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং তৃণমূল পর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন। বর্তমানের এই জ্বালানি সংকটকে যদি আমরা একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে কৃষি খাতকে আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে পারি, তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

 

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
 

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন

সর্বশেষ