জুনোটিক রোগের শঙ্কা

দেশের মানুষের আমিষের অভাব পূরণ করতে জোর দেয়া হচ্ছে গবাদিপশু পালনে। সেই সঙ্গে সংখ্যা ঠিক রেখে অধিক মাংস ও দুধ উৎপাদনেও জোর দেয়া হচ্ছে। ফলে দিন দিনই বাড়ছে গরু ও ছাগলের খামার। বর্তমানে দেশে ছাগলের সংখ্যা প্রায় পৌনে তিন কোটি। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব পশুর দেহে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের রোগ। জবাইকৃত ছাগলের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশের ফুসফুস ও লিভারে মিলছে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ন্যাচারাল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
গবেষণাটির জন্য রাজশাহী মেট্রোপলিটন এলাকার বিভিন্ন কসাইখানায় জবাই হওয়া ১৩১টি ছাগলের ৭০টি লিভার ও ৬১টি ফুসফুসের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর ভেতর ১২টি ছাগলের জরুরি এ দেহাংশই ছিল বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বর্ষাকালে। গবেষকরা বলছেন, ফুসফুস ও লিভার আক্রান্ত হওয়ার কারণে ছাগলের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বংশবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়, রয়েছে মৃত্যুঝুঁকিও। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ছাগলের এসব রোগের কারণে যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন জুনোটিক রোগে মানুষও আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে। ফলে ছাগলের যত্ন নেয়ার পাশাপাশি মাংস বিক্রিতে যথাযথ তদারকির পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।
‘প্যাথলজিক্যাল চেঞ্জেস অব লিভার অ্যান্ড লাঙ অব স্লটার্ড গোটস ইন রাজশাহী মেট্রোপলিটন এরিয়া অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একদল গবেষক। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আক্রান্ত হওয়া ফুসফুসে রক্তক্ষরণ, রক্ত জমাট বাঁধা, হেপাটাইজেশন বা ফুসফুস চর্বিযুক্ত হয়ে পড়া ও ফাইব্রিন ডিপোজিশন বা ঠাণ্ডার কারণে সাদা জেলিজাতীয় পদার্থ জমে থাকতে দেখা গিয়েছে। আর আক্রান্ত হওয়া লিভারে কালো রঙ ধারণ, লিভার থলথলে ও ফুলে ওঠা এবং ওপরের স্তর পাওয়া গিয়েছে অস্বচ্ছ।
গবেষণায় ব্ল্যাক বেঙ্গল ও যমুনাপারি ছাগলের ফুসফুস ও লিভার পরীক্ষা করা হয়েছে। যেখানে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ছিল ৯৪টি। এর মধ্যে নয়টিতেই সংক্রমণ ধরা পড়েছে। অর্থাৎ আক্রান্তের হার ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর বাকি ৩৭টি যমুনাপারি ছাগলের মধ্যে তিনটিতে মিলেছে সংক্রমণ, যেখানে আক্রান্তের হার ৮ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে মর্দা ছাগলে তুলনামূলক আক্রান্তের হার কম, ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর ছাগী আক্রান্ত হয়েছে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। বয়সের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে চার বছরের বেশি বয়সী ছাগল। আক্রান্তের হার ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। তিন-চার বছর বয়সীর আক্রান্তের হার ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ। দু-তিন বছরের ছাগলে আক্রান্তের হার ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আবার এক-দুই বছর বয়সী ১১ দশমিক ১১ শতাংশ ছাগলে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এছাড়া বর্ষাকালে আক্রান্তের হার ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। শীতে ও গ্রীষ্মে সেই হার যথাক্রমে ৮ দশমিক ৭ ও ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।
গবেষক দলের সদস্য খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি অ্যান্ড হিস্টোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. সুবর্ণা রানী কুণ্ডু বলেন, ছাগলের ফুসফুস ও লিভার আক্রান্ত হওয়ায় উৎপাদন কমে যায় বলে খামারি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আর লিভার আক্রান্ত হতে পারে বিভিন্ন কারণে। যেমন শামুক যখন ঘাসে ডিম পাড়ে আর সে ঘাস খেলে ছাগলের ফিতাকৃমি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেননা শামুক কৃমির জীবাণু বহন করে। ফলে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে যদি খামারি ভালো ব্যবস্থাপনা করতে পারে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। এছাড়া বর্ষাকালে ছাগল নিউমোনিয়া, পিপিআর, প্লেগসহ বিভিন্ন ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এতে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, রোগাক্রান্ত ছাগলের লিভার ও ফুসফুস খাওয়ার ফলে মানুষেরও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া সংস্পর্শে থাকার কারণেও যক্ষ্মাসহ নানা রোগ ছড়াতে পারে। কারণ যখন কসাই ছাগল জবাই করে ফুসফুস বা লিভার কাটেন, তখন তো গ্লাভস বা পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। আবার যারা ক্রেতা তারাও বাসায় নিয়ে খালি হাতে মাংস কাটেন। ফলে আক্রান্ত ফুসফুস বা লিভার থেকে রোগ ছড়াতে পারে। আর সাধারণ মানুষ তো আর দেখে বুঝতে পারে না কোনটা আক্রান্ত।
ড. সুবর্ণা রানী বলেন, আমরা যখন গবেষণা করছিলাম, দেখেই বুঝেছি যে লিভারটি একদম নষ্ট। অথচ সেটি বিক্রির জন্য নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতা। সাধারণ মানুষ কিন্তু সেটি নিয়ে খাবে। আবার অনেকে শহরে বা বিভিন্ন স্থানে এসব দিয়ে হালিম বানিয়ে বিক্রি করছে। এখন কেউ যদি এগুলো ভালো করে সিদ্ধ না করে তাহলেও জুনোটিক রোগ হতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে আরো বড় আকারে গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মকবুল হোসেন বলেন, নিউমোনিয়ার কারণে পুরো ফুসফুসই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার কারণে মূলত ফুসফুস আক্রান্ত হয়। আবার শামুক থেকে লিভারে সমস্যা হতে পারে। কৃমিতে বেশি আক্রান্ত হলে গরু ও ছাগলের লিভার সমস্যা হয়, এমনকি মারাও যায়। এজন্য নির্ধারিত সময় পরপর পরীক্ষা করে চিকিৎসা করাতে হয় গবাদিপশুকে। তাহলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে কম। তিনি বলেন, আক্রান্ত পশুর মাংস সিদ্ধ করে খাওয়ার কারণে সমস্যা হয় কম। এসব তদারকির জন্য মিট ইন্সপেকশন থাকলেও তারা ভালোভাবে তদারকি করতে পারে না। ফলে বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের ঝুঁকি থাকে। মানুষের টিবি-যক্ষ্মা, অ্যানথ্রাক্সসহ নানা রোগের ঝুঁকি থাকে। ভেটেরিনারিয়ানদের তদারকিতে মিট ইন্সপেকশন করানোর তাগিদ দেন এ অধ্যাপক। নতুবা এসব ঝুঁকি থেকেই যাবে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্য ভোক্তা সচেতনতা, ঝুঁকি ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের মনিটরিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ছাগলের ওপর করা গবেষণাটি সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে আমাদের নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিছুদিন আগেও আমরা কসাইখানার বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আরো আলোচনা করব।