www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ
শিরোনাম:

শখের বশে বুনো গয়াল বশে এনে সাফল্য


 এগ্রিবার্তা ডেস্কঃ    ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার, ১০:৫১   উদ্যোক্তা বিভাগ


গয়াল মূলত তৃণভোজী হওয়ায় গহিন বনের ঝোপঝাড়ের কচি পাতা ও ডালপালা খেয়েই বেঁচে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুনো গয়াল দলবদ্ধভাবে বাস করে। দলের নেতৃত্বে থাকে একটি বড় ও শক্তিশালী ষাঁড়। দেশী গরুর থেকে গয়ালের অন্যতম পার্থক্য হলো এটির শারীরিক গঠন। প্রতিটি গয়ালের গড় ওজন ৬০০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ কেজি পর্যন্ত হয়। অর্থাৎ দেশীয় গরুর চেয়ে গয়ালের ওজন প্রায় দ্বিগুণের বেশি

গয়াল, গরুর বিশেষ এক জাত। পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ে এর আনাগোনা। অনেকটা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা গরুর অনন্য এ জাতটি দুর্গম পাহাড়ে বসবাস করা নৃগোষ্ঠীগুলোর আমিষের চাহিদা মেটায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমতলে গয়ালের চাহিদা বাড়তে থাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সবৃদ্ধিতেও গয়াল হয়ে উঠেছে নতুন অনুষঙ্গ। সে কারণে অনেকে বিচ্ছিন্নভাবে বন্য এ গরু লালন-পালনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তবে খামারি পর্যায়ে গয়াল পালনের মাধ্যমে অনন্য সাফল্য দেখিয়েছেন চট্টগ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা এরশাদ মাহমুদ। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের সুখবিলাস গ্রামে তিনি গয়াল খামার গড়ে তুলেছেন।

গয়াল পালনের শুরুটা হয় ২০০৮ সালে। শখের বশে বন্য এ গরু পালন শুরু করলেও ধীরে ধীরে এটি বাণিজ্যিক আকার ধারণ করে। শুরুতে পার্বত্য এলাকার আদিবাসী পরিবারের কাছ থেকে তিনটি গয়াল সংগ্রহ করেন। নিজস্ব পাহাড়ি জমিতে মাচাং তৈরি করেন খামারি। বর্তমানে শতাধিক গয়াল রয়েছে তার খামারে। গয়ালের পাশাপাশি এখন তিনি পাহাড়ি টং গরু ও ভিন্ন ভিন্ন জাতের গরু পালন সম্প্রসারণেও কাজ করছেন।

গয়াল মূলত তৃণভোজী হওয়ায় গহিন বনের ঝোপঝাড়ের কচি পাতা ও ডালপালা খেয়েই বেঁচে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুনো গয়াল দলবদ্ধভাবে বাস করে। দলের নেতৃত্বে থাকে একটি বড় ও শক্তিশালী ষাঁড়। দেশী গরুর থেকে গয়ালের অন্যতম পার্থক্য হলো এটির শারীরিক গঠন। সাধারণত দেশের বিভিন্ন গরুর গড় ওজন ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু ছোট আকৃতির হলেও প্রতিটি গয়ালের গড় ওজন ৬০০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ কেজি পর্যন্ত হয়। অর্থাৎ দেশীয় গরুর চেয়ে গয়ালের ওজন প্রায় দ্বিগুণের বেশি। ভালো মানের কম চর্বিযুক্ত মাংসের কারণে প্রতিটি গয়াল সর্বোচ্চ সাড়ে তিন লাখ টাকায় বিক্রি হয়। সাধারণত ১০ থেকে ১১ মাস গর্ভধারণের পর স্ত্রী গয়াল একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। গাভির মতো এদের ওলান না থাকায় এক থেকে দেড় লিটারের বেশি দুধ পাওয়া যায় না। প্রাকৃতিক প্রজননের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করা গয়াল ১৫ থেকে ১৬ বছর বেঁচে থাকে। গয়ালের গড়ন ছোট আকৃতির হলেও মসৃণ ও সুঠাম। গয়ালের প্রতিটি পায়ের ১ ফুট পর্যন্ত রঙ বাদামি হয়ে থাকে। তবে দেশীয় জাতের সঙ্গে সংকরায়িত গয়াল সম্পূর্ণ কালো হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

এরশাদ মাহমুদের খামারে একাধিক জাতের গয়ালের সংকরায়ণ হয়েছে। তবে সংকরায়ণ করা হলেও পাহাড়ের প্রকৃত গয়াল জাতের বিশুদ্ধতা ধরে রেখেছেন তিনি। বাণিজ্যিক চিন্তার বাইরে শুধু জাতটিকে টিকিয়ে রাখতে নানা ধরনের প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

১৯৮৮ সাল থেকেই এরশাদ মাহমুদ কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করছেন। ২০১৩ সালে পেয়েছেন জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ মত্স্যচাষীর পুরস্কার। গয়াল চাষের প্রাথমিক সাফল্যের পর থেকেই নিজের গড়া খামারকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করতে পাহাড়ের বিলুপ্তপ্রায় গরু ও দেশের বিভিন্ন সংকটাপন্ন গরুর জাত সংরক্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি বান্দরবানের পাহাড় থেকে সংগ্রহ করেছেন দুটি বিরল প্রজাতির টং গরুর বাছুর। এটিকে দিয়ে টং গরুর সংকরের মাধ্যমে খামার বাড়াতে চান তিনি। পাশাপাশি চট্টগ্রামের লাল গরু, টার্কি, মহিষ, ভেড়া, পাহাড়ি মুরগি পালন করছেন এ উদ্যোক্তা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় পাঁচ একর জমিতে খামার স্থাপন করা হলেও পার্শ্ববর্তী সরকারি অনাবাদি পাহাড়ে গয়ালদের ছেড়ে দেয়া হয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পর গয়ালগুলো খামারে ফিরে আসে। এ খামার থেকে প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০টি গয়াল বিক্রি করা হয়। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৪১টি গয়াল বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে ৮০টি গয়াল অবশিষ্ট আছে খামারে। এর মধ্যে ১৭টি বিভিন্ন বয়সী গয়ালের বাচ্চা লালন করা হচ্ছে। মিলাদুন্নবীর মাসে আটটি গয়াল বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি একটি গয়াল সাড়ে তিন লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। চলতি বছরের এ পর্যন্ত প্রায় দুই কোটি টাকার গয়াল ও বিভিন্ন প্রজাতির গরু বিক্রি করা হয়েছে খামারটি থেকে।

এরশাদ মাহমুদ জানান, একসময় গয়াল বন্যপ্রাণী হিসেবে বিবেচিত হতো। তখন এটি ফাঁদ পেতে বন থেকে ধরে এনে চোরাই পথে বিক্রি করত শিকারিরা। কিংবা আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের পাহাড়ে বেড়ে ওঠা গয়াল নিজের কিংবা পাড়ার সম্পত্তি হিসেবে ভোগ করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী মানুষ অর্থনৈতিক প্রয়োজনে গয়াল সমতলের মানুষের কাছে বিক্রি করতে শেখে। আদিবাসীরা আমিষের প্রয়োজনেও গয়াল জবাই করে পাড়া-প্রতিবেশীদের উপহার হিসেবে দেয়। তবে পাহাড়ের নানান পরিবর্তনে গয়ালের সংখ্যাও কমে আসছে। শখের বশে গয়াল প্রতিপালন শুরু করলেও বর্তমানে শতাধিক গয়ালের একটি বৃহৎ খামার তার কর্মজীবনকে কর্মচাঞ্চল্যে ভরিয়ে তুলেছে। পেশার পাশাপাশি শখ এখন নেশায় পরিণত হয়েছে বলে জানান তিনি।




  এ বিভাগের অন্যান্য