বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থা দিন দিন কৃষকের জন্য আরও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। উৎপাদনের মূল চাকা হাতে রেখেও কৃষক এখন বাজারের সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ। পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে মিলার, পাইকার ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে। এর ফলে উৎপাদনকারী কৃষক যেমন ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত, তেমনি ভোক্তাও চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।
বর্তমানে কৃষিপণ্যের প্রান্তিক মূল্য ও ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। তারা শস্য প্রক্রিয়াজাত করে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে দাম বাড়িয়ে মুনাফা নিচ্ছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক। এবারের মৌসুমে আলু ও বিভিন্ন সবজির মূল্য ধসে উৎপাদন খরচ তুলনায় বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন তারা। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক মজুরি—সব কিছুর দাম পরিশোধ করেও তারা পাচ্ছেন না উৎপাদন খরচের কাছাকাছি দামটুকুও।
বিশ্বের কৃষিনির্ভর দেশগুলোতে কৃষকদের জন্য মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইজ (MSP) বা ফসল বিমা কর্মসূচি চালু থাকলেও বাংলাদেশে এখনো তা অনুপস্থিত। ভারত সরকার ২৩টি কৃষিপণ্য সরাসরি কিনে স্টক রাখে ও পরবর্তীতে বাজারে সরবরাহের মাধ্যমে দামের ভারসাম্য রক্ষা করে। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
দেশে ৩৬৬টি হিমাগার থাকলেও তা প্রধানত আলুর জন্য ব্যবহৃত হয়। পচনশীল সবজির জন্য কোনো বিশেষায়িত কোল্ডস্টোরেজ নেই। ফলে কৃষকদের বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। বছরব্যাপী চাহিদা নিরূপণ, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি বিপণন অধিদপ্তরেরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
এ সংস্থা একসময় ঘোষণা দিয়েছিল সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেবে। বাস্তবে তেমন কোনো সফল উদ্যোগ আজও দেখা যায়নি। কৃষক ও সরকারের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন ছাড়া কৃষিপণ্য বাজার ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা সম্ভব নয়।
এদিকে, এক কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে খরচ হয়েছে ২২–২৫ টাকা, সেখানে কৃষকদের তা মাত্র ১৪ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মৌসুম শেষে মাঠে পড়ে থাকা ফসল আর কৃষকের হাহাকার মিলিয়ে চিত্রটা আরও করুণ।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। দেশের কৃষি খাতকে সঠিক পথে আনতে জরুরি ভিত্তিতে একটি 'কৃষি কমিশন' গঠনের দাবি উঠেছে। এ কমিশন কৃষি ব্যবস্থার পূর্ণ পর্যালোচনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
