বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন উজাড়, বনভূমি দখল, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হওয়ায় হাতি, বাঘ, হনুমান, বানর, সাপসহ নানা বন্যপ্রাণী প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে। কখনো ফসল নষ্ট করছে, কখনো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় হাতির আক্রমণ বেড়েছে। বাঁশখালী ও চন্দনাইশে ১৫-২০টি বুনো হাতির পাল একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে শতাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, ও পেয়ারা বাগান ধ্বংস করেছে।
বনের গাছ কেটে চাষ করা হচ্ছে তামাক, যা প্রক্রিয়াজাতে ব্যবহৃত হচ্ছে স্থানীয় জলাশয়ের পানি ও বনজ কাঠ। এতে জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে, পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সব জলাশয় ছিল হাতি, বানর, শিয়াল, বন্য শূকরসহ প্রাণীদের পানির উৎস। জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় তারা ছুটে আসছে লোকালয়ে।
গত ২০ বছরে শুধু দক্ষিণ চট্টগ্রামে হাতির আক্রমণে প্রায় ২০০ জন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। অন্যদিকে, মাদারীপুর, যশোর, শরীয়তপুরে হনুমানরা খাদ্য সংকটে ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ছে। সরকারি খাবার লোভী মানুষ ভাগ করে নেওয়ায় পশুরা প্রাপ্য পাচ্ছে না। বন উজাড়, গাছ নিধন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বানর-হনুমানদের আবাস সংকট তৈরি হয়েছে।
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বাঘ ও সাপের উৎপাত বেড়েছে। খাদ্যের অভাবে বাঘ লোকালয়ে ঢুকে গবাদিপশু ও মানুষকে আক্রমণ করছে। ফলে মানুষ আত্মরক্ষায় বাঘ হত্যা করছে, যার ফলে কমে যাচ্ছে বাঘের সংখ্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ১০০ বছরে পৃথিবী থেকে ৯৭ হাজার বাঘ বিলুপ্ত হয়েছে। সুন্দরবনের বাঘও এখন মহাবিপন্ন। বাঘের প্রধান খাদ্য চিত্রা হরিণ, শূকর, মায়া হরিণও বিপন্ন। শিকার ও আবাসস্থল সংকটে বাঘ-মানুষ সংঘাত বাড়ছে।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে দেখা দিচ্ছে অতিবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা দুর্যোগ। আইইউসিএন-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে পৃথিবীর ২৫% উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্ত হতে পারে। বাংলাদেশেও বহু প্রজাতির পাখি, প্রাণী, গাছ, মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায়।
বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম—জাতিসংঘের মান অনুযায়ী ২৫% বনভূমির দরকার হলেও বর্তমানে বন রয়েছে মাত্র ৭.৭%। তাছাড়া চিংড়ি চাষ, আবাসন প্রকল্প, হোটেল-মার্কেট নির্মাণের জন্য উপকূলীয় বন কেটে ফেলা হচ্ছে। শালবন, পাহাড়ি বন উজাড় হচ্ছে ব্যাপক হারে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন দেশের একটি বড় অংশ মরুভূমিতে পরিণত হবে।
বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলের ১০-১৬% অংশ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে খাদ্য উৎপাদন, বাসস্থান, অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে আসা, নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব, পানির সংকট—সবই জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের আলামত। মানুষকে এখনই সচেতন হতে হবে। রক্ষা করতে হবে বন, জলাশয়, প্রাণীর আবাসস্থল। পরিবেশ রক্ষায় জৈব সার, ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার বাড়াতে হবে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার রোধ করতে হবে।
প্রকৃতি হুমকির মুখে। আর সময় নেই অবহেলার। এখনই ব্যবস্থা নিতে না পারলে সামনে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর ভবিষ্যৎ।
