পটুয়াখালীর চরাঞ্চল এ বছরও লাল-সবুজ তরমুজে ভরে উঠছে। জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এখন তরমুজের ক্ষেতে কর্মচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। রমজানকে সামনে রেখে চাষিরা দ্রুত ফল বাজারজাতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরইমধ্যে প্রথম সপ্তাহেই বাজার ধরার কৌশল নিয়েছেন অনেক উৎপাদক। দ্য নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, নদী ও সাগরঘেরা এ জেলার ভৌগোলিক অবস্থান তরমুজ চাষের জন্য খুবই অনুকূল। প্রতি বছরই নতুন নতুন চর জেগে উঠছে তেঁতুলিয়া নদীর তীর ঘেঁষে। আর এসব চর এখন পরিণত হয়েছে মৌসুমি কৃষির প্রধান ভরসায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে তেঁতুলিয়া নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে সারি সারি তরমুজের লতা। বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে চাষিদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। ট্রলারযোগে যাওয়ার সময়ই দূর থেকে দেখা যায় সবুজ ক্ষেতের বিস্তার। কালাইয়া ইউনিয়নের চরশৌলায়ও একই দৃশ্য। প্রতিটি জমিতে চলছে পরিচর্যা ও আগাম তোলার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময়ার করছেন চাষিরা।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর জেলায় বড় অঙ্কের বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে। শুধু উৎপাদিত তরমুজ বিক্রিই প্রায় ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। বীজ, সার, পরিবহন ও শ্রম ব্যয় মিলিয়ে সামগ্রিক অর্থচক্র আরও বিস্তৃত হবে।
কালাইয়ার চাষি এম এ হান্নান জানিয়েছেন, পটুয়াখালীতে তরমুজ এখন লাভজনক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় তিনি এবারও আবাদ বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ক্ষতির আশঙ্কা কম। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়-তুফানই একমাত্র দুশ্চিন্তার কারণ।
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের কৃষক মো. শাহীন মৃধা ৩০ একর জমিতে তরমুজ রোপণ করেছেন। তিনি জানান, ফলন সন্তোষজনক হয়েছে। রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিক্রি শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। বাজারদর ভালো থাকলে লাভও আশানুরূপ হবে বলে মনে করছেন তিনি।
একই ইউনিয়নের চাষি আব্দুল জব্বার আকন জানান, অধিকাংশ চাষি-ই এবার তরমুজ চাষে ঝুঁকেছেন। উচ্চ ফলন ও নগদ অর্থপ্রাপ্তির কারণে এ ফসল দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে প্রায় ২০ হাজার একর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন।
শুধু বাউফলেই নয়, জেলার আরও কয়েকটি উপজেলায় আবাদ বেড়েছে। রাঙ্গাবালী, গলাচিপা, দশমিনা ও কলাপাড়ার চরাঞ্চলেও বিস্তীর্ণ জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। মির্জাগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও আবাদ লক্ষ্য করা গেছে। চরভিত্তিক অর্থনীতিতে তরমুজ এখন প্রধান চালিকাশক্তি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল। এ বছর সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪৮০ হেক্টরে। আবাদ বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আমানুল ইসলাম বাসসকে বলেছেন, চলতি মৌসুমে তররুজ চাষের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বাণিজ্যের পরিমাণ।
তিনি আরও বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। রমজানকেন্দ্রিক চাহিদা ঘিরে এখন আশাবাদী জেলার তরমুজ চাষিরা। সবকিছু ঠিক থাকলে এ মৌসুমে পটুয়াখালীতে কয়েকশ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি হবে। চরের সবুজ ক্ষেত তাই এখন শুধু কৃষির প্রতীক নয়, সম্ভাবনারও প্রতিচ্ছবি।
