কাজু বাদাম একটি নাট বা বাদাম জাতীয় উচ্চমূল্যের ফল। বৃক্ষ জাতীয় ফসলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাজু বাদামের স্থান তৃতীয়। বাংলাদেশে প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ কাজু বাদাম আমদানি করতে হয়। তবে এবার পার্বত্য অঞ্চলে কাজুবাদাম চাষে সফলতা পেয়ে আশার আলো দেখছে কাপ্তাই উপজেলার রাইখালীতে অবস্থিত পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। বর্তমানে কেন্দ্রটির বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চাষ হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের কাজু বাদাম। গাছে গাছে দেখা যাচ্ছে পাকা লাল-কমলা রং ধারণ করা কাজু আপেল। সেই কাজু আপেল থেকে কাজু নাট ও কার্নেল সৃষ্টি হয়ে থাকে।
রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ের রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সূত্র জানা যায়, ২০২১ সালে অর্থাৎ ৫ বছর আগে এই গবেষণা কেন্দ্রে ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও স্থানীয় পার্বত্য অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা ১০০টি কাজুর জামপ্লাজম দিয়ে চাষ শুরু করা হয়। গাছগুলো বর্তমানে পরিপক্ব হয়ে ফল আসা শুরু হয়েছে। এসব গাছে সাধারণত ফুল আসে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে এবং ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে মে জুন মাসে। তাই বর্তমানে কেন্দ্রের গাছগুলোতে পাকা কাজুর আপেল ফলগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে কথা হলে রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমরা ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে ভারতের ভাস্করা বিএলএ-২৪, ভিয়েতনামের এম২৩ এবং পার্বত্য অঞ্চলের কিছু কাজু বাদামের জাতসহ অন্তত ১০০টি জামপ্লাজম নিয়ে চাষ শুরু করেছি। আমরা দেখেছি যে পার্বত্য অঞ্চলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজুবাদাম চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যে ১০০টি জামপ্লাজম নিয়ে গবেষণা করেছি তার মধ্যে এও রাই-০২৪, ০৩০, ০৩৭ এই লাইনগুলোতে বেশ ভালো ফলন পেয়েছি। বিশেষ করে কাজু বাদামের নাটের যে কোয়ালিটি, আপেলের যে সাইজ, সেফ কার্নেল বিষয়গুলোকে গবেষণাতে আমরা প্রাধান্য দিয়েছি।’
গবেষণায় দেখা গেছে, কাজু আপেলের ওজন ৮০ থেকে ৯০ গ্রাম হয়, নাটের যে ওজন তা ৮ থেকে ১০ গ্রাম হয় এবং কার্নেলটি ২ থেকে ৩ গ্রাম হয়ে থাকে। এই গাছে ফুল আসার ২ মাসের মধ্যেই ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। এছাড়া কাজুবাদাম বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের মাটিতে চাষের উপযোগী। বিশেষ করে মৃদু অম্লীয় মাটি, পিএইচ ৫.০ থেকে ৬.০ এই রেঞ্জের মাটিতে বেশ ভালো চাষ হয়ে থাকে। তবে কাজু বাদাম বন্যা লবণাক্ততা কাদামাটিতে ভালো ফলন হয় না। এছাড়া কাজু বাদামের মধ্যে কিছু পোকা মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘অনুমোদিত মাত্রায় যদি কীটনাশক স্প্রে করলে খুব সুন্দর ভাবে দমন করা সম্ভব হবে। কাজু বাদাম প্রক্রিয়াজাত করণ একটু কঠিন হলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রক্রিয়াজাত করণের সব মেশিনগুলো উদ্ভাবন করেছে। আশা করা যাচ্ছে, আমরা বিগত ৫ বছর ধরে এখানে কাজু বাদাম চাষে যেই কষ্ট করেছি তার সফলতার দ্বারপ্রান্তে আছি। খুব শীঘ্রই আমরা এই গবেষণা কেন্দ্র থেকে উন্নত কাজুবাদামের জাত দিতে পারবো বলে আশা করছি।’
রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘কাজুবাদামের উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি এই উপমহাদেশে বিশেষ করে বনায়ন ও মাটির ক্ষয়রোধ করার জন্য চাষ শুরু করা হয়। এটি এনাকর্ডিয়াম অক্সিডেন্টালের একটি উদ্ভিদ। এর গুরুত্ব অপরিসীম। তিন পার্বত্য অঞ্চলে এই কাজু বাদাম চাষ শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে কাজুবাদামের জন্য ১৪টি কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এই পার্বত্য অঞ্চলে ৫ লাখ হেক্টর অনাবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে যদি ১ লাখ হেক্টর জমিতেও কাজুবাদাম চাষ শুরু করা যায়, তাহলে আমাদের বছরে যে চাহিদা, প্রায় ৬০ টন; তা আমরা এখান থেকে পূরণ করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘তিন পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে কাজুবাদামের চাষ হচ্ছে এবং বছরে উৎপাদন হচ্ছে ১৫০০ মেট্রিক টন। তবে আমাদের যে ঘাটতি আছে সেক্ষেত্রে অনবাদি জমিগুলোতে যদি কাজুবাদাম চাষ শুরু করা হয় এতে একদিকে যেমন কৃষকরা লাভবান হবেন। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অনেক পরিমাণে সাশ্রয় হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাজুবাদামের যদি পুষ্টিগুণ আমরা বিচার করি সেক্ষেত্রে কাজুবাদামে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, শর্করা, চর্বি, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি-সি ইত্যাদি আছে। যেগুলো আমাদের মস্তিকে শক্তি যোগাতে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সেইসঙ্গে শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে। কাজু বাদামে যে পুষ্টিগুণ আছে তা ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ কমাতেও সহায়তা করে।’
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমরা যদি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের কাজু বাদামের জাতগুলো কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারি, তাতে প্রথম তিন বছরেই ফুল ও ফল আসা শুরু হবে। এবং ৯ থেকে ১০ বছরের পূর্ণ বয়স্ক গাছ থেকে বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি কাজু নাট সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত কাজু আপেল সংগ্রহ করা যাবে। সাধারণত কাজুর নাট ব্যবহার করলেও কাজুর আপেলটি ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু চাইলে এই কাজুর আপেল থেকে জুস ও জেলি তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া উচ্ছিষ্ট অংশ গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাপ্তাইয়ের পাহাড়ি অঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির গুণাগুণ কাজুবাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। সঠিক পরিচর্যা করলে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফলন পাওয়া সম্ভব। এটি স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে।’
প্রসঙ্গত, ১৯৭৬ সালে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় প্রায় ১০০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। পাহাড়ি অঞ্চলের উপযোগী ফসল ও কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে।
