নওগাঁ জেলার সদর উপজেলার হাঁপানিয়া ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী বৃষ্টি বানু ব্যতিক্রমী এক জাতের বেগুন চাষ করে এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। দেখতে অনেকটা লাউয়ের মতো হলেও এটি আসলে বেগুন, যার জাতের নাম বারি ১২।
রফিকুল ইসলাম জানান, “গত সপ্তাহে নওগাঁ হাটে দেড় মণ বেগুন নিয়ে গিয়েছিলাম। দূর থেকে সবাই ভাবছিল এগুলো লাউ। কিন্তু কাছে গিয়ে সবাই অবাক হয়। অন্যান্য সাধারণ বেগুন যেখানে ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়, সেখানে আমি আমার চাষ করা এই বেগুন ১,৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছি। মুহূর্তেই সব বিক্রি হয়ে যায়।”
রফিকুলের স্ত্রী বৃষ্টি বানু বলেন, “আমাদের ১৫ শতক জমির জন্য মৌসুমি নামের একটি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ৬০০টি চারা পেয়েছিলাম। সেই চারা বড় হয়ে এখন প্রচুর বেগুন ধরেছে। প্রতিটি বেগুনের ওজন এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত হচ্ছে। বাজারে এগুলো বিক্রি করে আমরা বেশ ভালো লাভ করতে পারছি।”
রফিকুলের এই বিশেষ বেগুন ক্ষেতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের গ্রাম থেকে বহু মানুষ আসছেন এই ‘লাউ বেগুন’ দেখতে। স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন ও কেরামতউল্লাহ বলেন, “এত বড় বেগুন আমরা জীবনে দেখিনি! অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে যে একটা বেগুনের ওজন দেড় কেজি পর্যন্ত হতে পারে। আমরাও আগামী বছর এই জাতের বেগুন চাষের পরিকল্পনা করছি।”
রফিকুল ইসলাম ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। পরে পারিবারিক প্রয়োজনে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। শুরুতে বিভিন্ন ফসল চাষ করলেও আশানুরূপ ফল পাননি। পরে তিনি ও তার স্ত্রী বৃষ্টি বানু ‘মৌসুমি’ নামের একটি উন্নয়ন সংস্থার সদস্য হন। পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় তারা ২০২৪ সালে বারি ১২ জাতের বেগুন চাষের প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ৬০০টি চারা দেওয়া হয়, যা তারা নিজেদের ১৫ শতক জমিতে রোপণ করেন। এখন সেই গাছে প্রচুর বেগুন ধরেছে।
নওগাঁ কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই বিশেষ জাতের বেগুনের ওজন এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত হয় এবং প্রতিটি গাছে সাত থেকে আট কেজি পর্যন্ত বেগুন উৎপাদিত হচ্ছে। সাধারণ বেগুনের তুলনায় এটি আকারে বড়, গুণগত মানেও উন্নত। রোগবালাই কম থাকায় এর পরিচর্যায় খরচও কম পড়ে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, “বারি ১২ জাতের এই বেগুনে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন ‘এ’, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে। এতে রক্তশূন্যতা দূর হয়, চোখের পুষ্টি মেলে এবং দাঁত ও হাড়ের গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এটি উচ্চ ফলনশীল একটি জাত, যা ব্যাকটেরিয়াজনিত ঢলে পড়া রোগ সহনশীল।”
তিনি আরও বলেন, “এই নতুন জাতের বেগুন প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৭ টন পর্যন্ত উৎপাদন হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করলে এই জাতের বেগুন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।”
মৌসুমী’র কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান আরিফ বলেন, “পিকেএসএফ-এর আর্থিক সহায়তায় রফিকুল দম্পতিকে এই বেগুনের চারা দেওয়া হয়। তারা সফলভাবে চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। তাদের এই সফলতা দেখে এলাকার অনেকেই এই জাতের বেগুন চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।”
