গেল সপ্তাহে ঈশ্বরগঞ্জে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। বাড়ির পাশেই স্মৃতিবিজড়িত কাঁচামাটিয়া নদী। বাড়িতে গেলে কাঁচামাটিয়া নদীর দেশি মাছের খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করি। আলাপচারিতায় জানা গেল, সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর নদীতে দেশি মাছ ধরা পড়ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পাতিলে করে দেশি মাছ নিয়ে হাজির হলো এক খুদে মৎস্য শিকারি। পাতিলের পাঁচমিশালি মাছের মধ্যে আছে পাবদা, গুলশা, টেংরা, শিং, টাকি, পুঁটি, তারা বাইম, খলিসা, মেনি, গুতুম ইত্যাদি। পাতিল নাড়াচাড়া করে দেখা গেল একটি-দুটি ছোট কই পাতিলে উঁকি দিচ্ছে। আকার ও বনেদি রং দেখে নিশ্চিত হলাম এগুলো দেশি কই।
বহুদিন পর নদী থেকে সরাসরি আহরিত দেশি কই দেখতে পেলাম। অবশেষে নিকটাত্মীয় মাহফুজ ও মিঠু কেজি দেড়েক মাছের দাম ৩০০ টাকা দিয়ে শিকারিকে বিদায় করলেন। শিকারি আবার ছুটল মাছ ধরতে।
আবহমান বাংলার অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় মাছ কই।
ভাজা কই খেতে কার না ভালো লাগে। কই মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Anabas testudineus এবং ইংরেজি নাম Climbing Perch। এদের দেহে অতিরিক্ত শ্বসন অঙ্গ আছে। অতিরিক্ত শ্বসন অঙ্গ ভেজা থাকলে এরা টানা কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহ পানি ছাড়া বাঁচতে পারে। কোনো জলাশয় শুকিয়ে গেলেও মাটির নিচে কই মাছ লুকিয়ে বেঁচে থাকে।
এদের প্রজননকাল এপ্রিল থেকে জুলাই। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে দেশি কই মাছের কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। গবেষকদলে ছিলেন ড. এ এইচ এম কোহিনুর ও ড. মশিউর রহমান। প্রজননক্ষম দেশি কই মাছে হরমোন ইনজেকশন দেওয়ার পর প্রাকৃতিক প্রজননের মাধ্যমে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর এরা ডিম দেয়; এর ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। সর্বভুক শ্রেণির এই কই মাছ জলাশয়ের তলদেশে বাস করে এবং প্লাংকটন, পোকামাকড়, ক্রাস্টাসিয়ানস, মাছের ছোট পোনা ইত্যাদি খায়। এরা ওজনে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। একসময় দেশের খাল-বিল, নদ-নদী ও ধানক্ষেতে প্রচুর কই মাছ পাওয়া যেত। সবই এখন স্মৃতি। চাষাবাদেও দেশি কইয়ের খুব একটা সফলতা আসেনি। তবে এদের হারানোর গল্পটা একটু ভিন্ন।
আশির দশককে আমরা বলি দেশে মাছ চাষের যাত্রাকাল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা হলে মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে দেশে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা শুরু হয় এবং প্রযুক্তিসেবা চাষিদের দোরগোড়ায় আসতে থাকে। দেশি কই মাছ চাষে দেখা যায়, পুকুরে এরা সম্পূরক খাদ্য গ্রহণ করে না এবং দৈহিক বৃদ্ধি খুবই কম হয়। এতে চাষিরা দেশি কই চাষে এক পর্যায়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ২০০২ সালে দেশে অনুপ্রবেশ করে থাই কই। গবেষণায় দেখা যায়, এই জাতের কই পুকুরে সম্পূরক খাদ্য গ্রহণ করে এবং এদের দৈহিক বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ফলে দেশি কইয়ের স্থান আস্তে আস্তে দখল করে নেয় থাই কই। কিন্তু থাই কইয়ের স্বাদ দেশি কইয়ের মতো না হওয়ায় এবং এদের দেহে স্পট থাকায় এই জাতটিও আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তা হারায়। ফলে দেশি কইয়ের পুরুষ এবং থাই কইয়ের স্ত্রী মাছকে ক্রস করিয়ে অনেকটা দেশি কইয়ের মতো দেখতে স্পটবিহীন একটি জাত তৈরি করা হয়। কিন্তু এরই মধ্যে ২০১১-১২ সালে দেশে চলে আসে ভিয়েতনামি কই। এই কইয়ের দৈহিক বৃদ্ধি দেশি কইয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি, সহজেই সম্পূরক খাদ্য গ্রহণ করে ও এদের দেহে কোনো স্পট নেই। এতে মাছটি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় ব্যাপক হারে ব্যবহার শুরু হয়। এরা আকারে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। তিন থেকে চার মাস পুকুরে চাষ করলেই এরা ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম হয়ে ওঠে এবং বাজারজাত করা যায়। এভাবে একজন চাষি বছরে তিনটি চাষ করে অধিক লাভবান হতে পারেন। স্বাদে ততটা দেশি কইয়ের মতো না হলেও বর্তমানে বাজারে একচেটিয়া রাজত্ব করে যাচ্ছে ভিয়েতনামি কই। প্রকারান্তরে আমরা হারাতে বসেছি দেশি কইয়ের জাত। কিন্তু এভাবে দেশি কই মাছকে আমাদের হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। এদের সুরক্ষায় সরকারি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন করে নদ-নদী ও হাওর-বিলে অবমুক্ত করতে হবে এবং অবাধে প্রজননের সুযোগ করে দিতে হবে।
লেখক : কৃষিবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ; ইমেইল : yahiamahmud@yahoo.com
(সূত্র- কালের কন্ঠ )
