ঢাকা, ২ মে ২০২৬, শনিবার

ময়মনসিংহে ৩৫০ মৎস্যচাষীকে প্রশিক্ষণ দিলো নারিশ



মৎস্য

মুসাদ্দিকুল ইসলাম তানভীর, বাকৃবি প্রতিনিধি

(২ ঘন্টা আগে) ২ মে ২০২৬, শনিবার, ৮:৪০ অপরাহ্ন

agribarta

মাছ চাষের জন্য বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সুখ্যাতি অনেক পুরোনো। দেশের মাছ উৎপাদনেও শীর্ষে ময়মনসিংহ জেলা। বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় মাছের উৎপাদন আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এলক্ষ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহের মাছ চাষীদের বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি বিষয়ক  প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড।

এর অংশ হিসেবে ময়মনসিংহে চারটি ও নেত্রকোনায় একটি উপজেলায় দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন ৭০ জন করে পাঁচ দিনে ৩৫০ জন বড় মৎস্যচাষী, ফিড ডিলার, খুচরা বিক্রেতাকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনে নারিশ। এছাড়া কোম্পানির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ এসময় উপস্থিত ছিলেন। 

“গুণগত খাদ্য পরিমিত পরিমাণ, মাছের বৃদ্ধি চাষির লাভ” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ কর্মশালার সার্বিক সহযোগিতা করেছে ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টস কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি)।

মৎস্য চাষীদের প্রথম প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয় নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহের ফুলপুর, মুক্তাগাছা, সদর (শম্ভুগঞ্জ) ও ফুলবাড়িয়ায় খামারীদের নিয়ে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রতিদিন দুই সেশনে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেশনে মাছের বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং দ্বিতীয় সেশনে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী।

কর্মশালাকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে প্রশিক্ষণার্থীদের পাঁচটি দলে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দল পুকুরের মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ, পুকুরের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করে। পরে দলভিত্তিক তথ্যসমূহ উপস্থাপন করে একটি করে পোস্টার তৈরি করে প্রদর্শন করা হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের মূল্যায়নের জন্য কুইজেরও আয়োজন করা হয়।

গ্লোবাল স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ট্রেড ম্যানেজার মার্ক সিভিয়ার বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির কৃষক ও খামারিদের সমন্বয়ে গঠিত। নয়টি অফিসের মাধ্যমে আমরা ৭০টি দেশে কাজ করছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে মৎস্য খাতের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। এই ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খামারিরা সঠিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ উৎপাদন কৌশল সম্পর্কে বাস্তবধর্মী ধারণা পাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের এভিপি সামিউল আলিম বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে নিরাপদ পণ্য উৎপাদনই আমাদের লক্ষ্য। এই ক্ষে‌ত্রে নারিশ সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে অ্যান্টিবায়োটিক ও কেমিক্যালমুক্ত মাছের খাদ্য উৎপাদন করে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএসও এবং এইচএসিসিপি স্বীকৃত আমাদের ফিডে অতিরিক্ত মিনারেল বা ভিটামিন ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।’

মহাব্যবস্থাপক  এস এম এ হক বলেন, ‘মাছ চাষে লাভবান হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি খামারির হাতে। পুকুরে অতিরিক্ত ঘনত্ব বাড়ালে লাভ নয়, ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। পুকুরের অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া মাত্রা এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনার নিয়মাবলি জানা অত্যন্ত জরুরি। নারিশ ফিড ব্যবহারে পানির রঙের পরিবর্তন হয় না এবং মাছ সতেজ থাকে।’

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী ফুলপুরের একজন মৎস্যচাষী মোঃ আব্দুল করিম বলেন, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা পুকুর ব্যবস্থাপনা, সঠিক খাদ্য প্রয়োগ এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান পেয়েছি। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ কমবে এবং মাছের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করছি।

স্থানীয় ফিড ডিলার মো. সোহেল রানা বলেন, এই প্রশিক্ষণ আমাদের জন্য খুবই উপকারী হয়েছে। এখন আমরা খামারীদের আরও সঠিকভাবে পরামর্শ দিতে পারব, যা ভালো মানের ফিড ব্যবহার ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রশিক্ষণে তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারিক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রাখা হয়, যা অংশগ্রহণকারীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে। আধুনিক ও অর্থসাশ্রয়ী পদ্ধতিতে পুকুর ব্যবস্থাপনা, সুষম খাদ্য ব্যবহার এবং উন্নত উৎপাদন নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। ফলে অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা তাদের খামার ব্যবস্থাপনায় সরাসরি প্রয়োগযোগ্য।

প্রসঙ্গত, নারিশ ফিড বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। মানসম্মত ফিড উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি খামারিদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পরামর্শ প্রদান করে থাকে, যা দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রশিক্ষণে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অ্যাকুয়াকালচার উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি বিষয়ে তার বিস্তৃত অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল ও প্ল্যাটফর্মে তার ১৪৩টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।


এছাড়া ইউএস গ্রেইনস এন্ড বায়োপ্রোডাক্টস কাউন্সিল একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা বিশ্বব্যাপী শস্য ও বাইয়োপ্রোডাক্ট ব্যবহারের প্রসার এবং প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সংস্থাটি প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে খাতটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ভবিষ্যতেও দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় অঞ্চলে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানা যায়।