দেশের প্রাকৃতিক কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হালদা নদী। নদীর মা মাছের উৎপাদিত ডিম থেকে যে রেণু বা পোনা তৈরি হয়, তার আর্থিক মূল্য দেশের মৎস্য অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। গবেষণায় বলছে, নদী থেকে সংগৃহীত ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের বিষয় সঠিকভাবে পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে হালদার একটি মা মাছ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ৪ কোটি টাকার সমমূল্যের পোনা উৎপাদন সম্ভব। হালদা নদী দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র নদী, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে মা মাছ ডিম ছাড়ে। প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অমাবস্যা, পূর্ণিমার ছয় তিথি/জোতে হালদা নদীতে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ কার্প জাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে। নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলপ্রবাহ এবং তলদেশের মাটি ডিম ছাড়ার জন্য উপযুক্ত বলে এখানে ডিমের মানও উন্নত। তাই ব্যতিক্রমধর্মী এ নদীকে মা মাছের ‘মেটারনিটি ক্লিনিক’ বলা হয়।
১৯৯৯- ২০০৮ সাল পর্যন্ত হালদা থেকে গড়ে প্রতি বছর ৩০ কোটি ২৩ লাখ ২০ হাজার রেণু পাওয়া গেছে। এর পরিমাণ প্রায় ৬০৪ দশমিক ৬৪ কেজি। প্রতি কেজি রেণুর দাম ৩৫ হাজার টাকা ধরলে বাজারমূল্য দাঁড়ায় ২ কোটি ১১ লাখ ৬২ হাজার ৪০০ টাকা। ৪০ শতাংশ মৃত্যুহার ধরে হিসাব করলে দ্বিতীয় ধাপে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। তৃতীয় ধাপে আবার ৪০ শতাংশ মৃত্যুহার ধরলে পোনার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি ৮৮ লাখ ৩৫ হাজার ২০০। প্রতি কেজি পোনার দাম দুই লাখ টাকা ধরলে তৃতীয় ধাপে আয় হয় ২১ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার ৪০০ টাকা। চতুর্থ ধাপে ৪০ শতাংশ মৃত্যুহার ধরলে পোনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ কোটি ৫৩ লাখ ১ হাজার। হালদার পোনা চাষ করলে বছরে গড়ে এক কেজি হয়। এই হিসাবে মাছের পরিমাণ ৬ কোটি ৫৩ লাখ ১ হাজার কেজি। প্রতি কেজির দাম সর্বনিম্ন ১২০ টাকা ধরে গবেষকরা বলছেন এই ধাপে আয় দাঁড়ায় ৭৮৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে হালদা থেকে বছরে ৮২১ কোটি ১০ লাখ টাকা টার্নওভার হয়।
হালদা নদী খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার বদনাতলি পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এটি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রায় ৯৮ কিলোমিটার অতিক্রম করে চট্টগ্রাম শহরের কালুরঘাটে গিয়ে কর্ণফুলী নদীতে মিলিত হয়েছে। হালদার মূল স্রোতের সঙ্গে বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া মিলিত হয়ে এটিকে সমৃদ্ধ করেছে। উৎসমুখের পর থেকে ২০টি বড় খাল বা ছড়া ও প্রায় ৩৪টি ছোট পাহাড়ি ছড়া মিশেছে।
হালদাকে কেন্দ্র করে হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। দুই পাড়ের প্রায় ১ হাজার ৫৪৪ জন জেলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হালদার ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করেন।
