ঢাকা, ৪ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার

টাঙ্গাইলের মহিষমারা কলেজে শেখানো হয় বীজ থেকে চারা উৎপাদনের কৌশল



কৃষি

বাসস

(৭ ঘন্টা আগে) ৩ আগস্ট ২০২৬, সোমবার, ৮:৩১ অপরাহ্ন

agribarta

বিভিন্ন বয়সী ছেলে মেয়েসহ শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার ও স্ক্রিন টাইমের ফলে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে কোভিডের সময় অনলাইনে ক্লাস করার পর থেকেই মোবাইল আসক্তিতে পড়েছে নতুন প্রজন্ম। এমন সময় সারা দেশের বিভিন্ন বয়সী ছেলে মেয়েসহ শিক্ষার্থীরা যেখানে ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সে সময় মোবাইল ছেড়ে হাতে খুন্তি-কোদাল,কাস্তেসহ কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে ফসলি মাঠে হাতে কলমে কৃষি শিক্ষা গ্রহণে বীজ থেকে চারা উৎপাদনের কৌশল শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে টাঙ্গাইলের মহিষমারা কলেজে।

ব্যতিক্রমী এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, জেলার মধুপুর উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা মহিষমারা গ্রামে। এ গ্রামের আদর্শ কৃষক ছানোয়ার হোসেন ২০১৩ সালে ‘মহিষমারা কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ১৩৫ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে এখন শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩ শতাধিক।

টাঙ্গাইল শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং মধুপুর উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে মহিষমারা গ্রামের অবস্থান। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। মধুপুরের বিখ্যাত আনারস চাষের অন্যতম এলাকা এটি। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র কৃষক। তাই স্কুল পেরুনোর পর অনেক অভিভাবক সন্তানদের কলেজে পড়াতে পারতেন না। সেই লক্ষ্যে মহিষমারা কলেজ এ এলাকায় শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেছেন এলাকার আদর্শ কৃষক ছানোয়ার হোসেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার মধুপর উপজেলার মূল শহর থেকেই পাকা সড়ক। অজ পাড়াগাঁ পেড়িয়ে সোজা গারো বাজার। যাওয়ার পথে বিল সবুজ ধান ক্ষেতের অবারিত দিগন্ত। যেন চোখ জুড়ানো। গারো বাজারের পাশের বৃহত্তর গ্রামটির নাম মহিষমারা।

মহিষমারা গ্রামের শুরুতেই কলেজটির অবস্থান। কলেজে প্রবেশ করে দুপুরের দিকে দেখা যায়, দুটি শ্রেণিতে ক্লাস চলছে। আর উৎপাদনমুখী শিক্ষা কর্নারে অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী কাজ করছেন।

কলেজটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছানোয়ার হোসেন তাদের সবজি বীজ বোনার আগে মাটি তৈরি ব্যবস্থাপনা শেখাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা তার নির্দেশনাতে মাটি তৈরির কাজ করছেন। এ সময় কৃষক ছানোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

আদর্শ কৃষক ছানোয়ার হোসেন এ সময় বাসস’কে বলেন, ১৯৯২ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর তিনি সিলেটের একটি স্কুলে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। সেখানে প্রায় সাড়ে ৩ বছর চাকরি করে ফিরে আসেন গ্রামে। গ্রামের স্কুলে দুই বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কৃষির আকর্ষণে তিনি সেই চাকরিও ছেড়ে দেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আনারস, কলা, হলুদ, ভুট্টা, মাল্টা, ড্রাগন, পেয়ারা, কফিসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে সফল হয়েছেন।

তিনি বলেন, আমার গ্রাম মহিষমারা এলাকার ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো কলেজ নেই। দরিদ্র কৃষক পরিবার তাদের সন্তানদের দূরে ছাত্রাবাসে রেখে পড়াতে পারে না। তাই সিদ্ধান্ত নেই, নিজ এলাকায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করবো।

২০২২ সালে জাতীয় কৃষি পুরস্কার প্রাপ্ত আদর্শ কৃষক ছানোয়ার হোসেন জানান, তার বাবার ৯৫ শতাংশ জমি আর তার নিজের ৪০ শতাংশ মিলে ১৩৫ শতাংশের উপর ২০১৩ সালে মহিষমারা কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিগত ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে এই কলেজে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য ১৮ জন শিক্ষক রয়েছেন। সরকারের শিক্ষা বিভাগ থেকে একটি পাকা ভবনও এই কলেজে করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে গ্রামে বসে চাষবাস করেও ভালোভাবে চলা সম্ভব। তাই শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শেষে চাকরি না পেলে যাতে বেকার বসে না থাকেন, সে জন্য তাদের উৎপাদনমুখী শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনার উদ্যোগ নেন তিনি।

ছানোয়ার হোসেন জানান, আমাদের দেশের মাটি উর্বর। এখানে যেকোনো ফসল ফলানো যায়। জমি ছাড়াও রাস্তাঘাট, বাড়ির ছাদ যেখানে খুশি চাষাবাদ করা যায়। কিন্তু কৃষি নির্ভর দেশ হলেও কৃষি বিষয়টি অবহেলিত। লেখাপড়ার পর কেউ আর মাঠপর্যায়ে কৃষিকাজ করতে চান না। তাই শিক্ষিত যুবকদের কৃষি মুখী করতেই এই উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছি।

কলেজের শিক্ষক ও স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, ২০১৮ সালে কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। এ জন্য কলেজের পূর্ব দিকে ৪০ শতাংশ জায়গায় একটি কর্নার গড়ে তোলা হয়। যেখানে শিক্ষার্থীদের ছানোয়ার হোসেন পড়াশোনার ফাঁকে হাতে-কলমে বিষমুক্ত নিরাপদ ফসল উৎপাদন শেখান। সেখানে বিভিন্ন মৌসুমের সবজি, ফল, মসলার চারা তৈরিও শেখানো হয়। এখানে চাষবাস শিখে শিক্ষার্থীরা তাদের বাড়িতেও সবজি বাগান করতে পারেন।

কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজের এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে কীটনাশকমুক্ত সবজি আবাদ শিখেছেন তারা। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তারা বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করছেন। এ কারণে তাদের পিতা-মাতা অনেক খুশি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বড় হয়ে কৃষি অফিসার হবে।

কলেজের প্রভাষক শহিদুল ইসলাম বলেন, কলেজের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে কৃষিতে তরা উৎপাদনমুখী শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। কলেজে ক্লাসের বিরতিতে এবং ছুটির পর বিভিন্ন গ্রুপ করে শিক্ষার্থীদের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করা হয়। শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে এ কাজে অংশ নেয়।

মহিষমারা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বাসস’কে বলেন, কলেজের শিক্ষকরা অনেক পরিশ্রমী। পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনমুখী শিক্ষা শিক্ষার্থীদের একদিকে মোবাইল ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক থেকে যেমন রেহাই পাচ্ছে। অন্যদিকে বাড়িতেও মা-বাবাকে কৃষি কাজে সহযোগিতা করার মনোভাব সৃষ্টি তৈরি হচ্ছে।

কলেজের সভাপতি ও মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার ফলেই প্রান্তিক পর্যায়ের একটি কলেজ এত অল্প সময়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষ করলেই যে চাকরি পাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই এসব শিক্ষার্থীরা যদি পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনমুখী শিক্ষার প্রশিক্ষণ নিতে পারে তাহলে কৃষিনির্ভর এ দেশে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

কৃষি থেকে আরও পড়ুন

সর্বশেষ