অধিক উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে ব্যবস্থা নিক কৃষি মন্ত্রণালয়

সমকালীন কৃষি/
এগ্রিবার্তা ডেস্ক

(২ মাস আগে) ১৩ মার্চ ২০২৩, সোমবার, ৯:০৮ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৭:৩৪ পূর্বাহ্ন

agribarta

কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ার পরও আমাদের দেশের কৃষিজমি প্রতিনিয়ত কমছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়ণের প্রসারের ফলে কৃষিজমিতে আবাসন ও শিল্প-কারখানা স্থাপনের দরুন এ বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। একদিকে বসবাসের প্রয়োজন অন্যদিকে খাবারের চাহিদা—এ দুটো ক্ষেত্রে ভারসাম্য তৈরি না হলে ভবিষ্যতে যে সংকটের মুখোমুখি হতে হবে সেটি উপলব্ধি করে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। সেজন্য জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের প্রধান খাবার চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য উদ্যোগী হতে হবে। বর্তমানে ধানের সংকট না হলেও যেভাবে চাহিদা বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে সংকটে পড়তে হতে পারে। এজন্য ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে ধানের অধিক উৎপাদনশীল নতুন জাত উদ্ভাবন ও জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে উৎপাদন বাড়াতে হবে বলে কৃষিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন। অধিক উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও কৃষি মন্ত্রণালয়কে ভূমিকা রাখতে হবে।

দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও কৃষিজমি ১ শতাংশ হারে কমছে। এ কারণে প্রধান খাদ্যশস্য ধানসহ অন্যান্য শস্যের জোগান নিশ্চিতে উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বর্ধিত জনসংখ্যার সমানুপাতে দেশে উদ্ভাবিত ধানের জাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলো উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও তা আসলে ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে জিনগত কারণে উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত কারণও জড়িয়ে রয়েছে।

কৃষিজমি কমার ক্ষেত্রে শুধু মানবসৃষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতির প্রভাবই নয়, দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে আমাদের যেভাবে বন্যা, লবণাক্ততা ও খরার মতো প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়, তাতে ধানের উৎপাদনশীলতা না বাড়লে ভবিষ্যতে সংকট অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে।

এটা সত্য, এশিয়া মহাদেশে ধানের জিনগত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়ে সীমিত আকারে গবেষণা হয়েছে। এমনকি আমাদের দেশে ভাত প্রধান খাদ্য হওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে আগে কোনো গবেষণা হয়নি। এক্ষেত্রে ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ধানের জিনগত কারণে উৎপাদনশীলতা আরো কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। এছাড়া বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হওয়ায় জলবায়ুজনিত ঝুঁকিসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। কেননা জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে উৎপাদনশীলতায় ভারসাম্য না থাকলে ভবিষ্যতে দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ধানের জাতগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। উন্নত দেশের উদাহরণ প্রসঙ্গে চীনের প্রসঙ্গ চলে আসে। ধান উৎপাদনে চীন বিশ্বে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, চীন আমাদের চেয়ে উৎপাদনশীলতার হারে এগিয়ে রয়েছে। উত্তর ও পশ্চিম চীনের পার্বত্য অঞ্চল ব্যতীত প্রায় সমগ্র চীনেই ধান উৎপাদন হয়। অত্যধিক ধান উৎপাদিত হওয়ায় দেশটির হুনান প্রদেশকে ‘পৃথিবীর ধানের আধার’ বলা হয়। দেশটিতে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি।

আমাদের দেশে পার্বত্য অঞ্চল ব্যতীত প্রায় সর্বত্রই কমবেশি ধান উৎপাদিত হয়। বরিশাল, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, পটুয়াখালী, রাজশাহী ও রংপুর জেলায় প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপাদিত হয়ে থাকে। তবে আমরা ধান উৎপাদনকারী প্রধান দেশগুলোর তালিকায় থাকলেও জনবহুল দেশ হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কম অবদান রাখতে পারছি। মূলত ধান উৎপাদনকারী যেসব দেশে জনসংখ্যা ও চাহিদা কম সেসব দেশ অধিক পরিমাণ রফতানি করতে পারে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে। হেক্টরপ্রতি উৎপাদন কম হলেও অধিক পরিমাণ জমি আবাদ করায় চাল রফতানিতে ভারত শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, জাপান ও ব্রাজিল ধান উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে প্রায় সর্বত্র ধান উৎপাদন হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম হওয়ায় বিশ্বে চাল রফতানিতে থাইল্যান্ড শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপানে ধান চাষের উপযুক্ত জমির পরিমাণ খুব কম হলেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন অনেক বেশি। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের অর্ধেকের বেশি ধান ব্রাজিলে উৎপাদিত হয়। এ দেশগুলো ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, শ্রীলংকা, লাওস, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ধান উৎপাদন হয়। এছাড়া মিসর, নাইজেরিয়া, মাদাগাস্কার, মোজাম্বিক, সেনেগাল, কলম্বিয়া, পেরু, উরুগুয়ে, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরাক প্রভৃতি দেশে সামান্য পরিমাণে ধান উৎপাদিত হয়।

পৃথিবীর অধিকাংশ ধান মৌসুমি জলবায়ুভুক্ত এশিয়ার দেশগুলোয় উৎপাদিত হলেও বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অবদান তুলনামূলক কম। সাধারণত জনবহুল দেশগুলো চাল আমদানি করে এবং কম জনসংখ্যার দেশগুলো চাল রফতানি করে। ধান উৎপাদনকারী থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যা এবং চাহিদা কম থাকায় দেশগুলো অধিক পরিমাণে চাল রফতানি করে থাকে।

আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদার কারণেই ধান রফতানিতে শীর্ষ দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে যে অবস্থান রয়েছে, সেটি ধরে রাখার জন্যই আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মনোযোগী হতে হবে।

বাংলাদেশ ধান উৎপাদনশীলতায় এশিয়ায় শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও এতে তৃপ্তির ঢেকুর তুললে হবে না। ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে এ শীর্ষ অবস্থানে উন্নতির রূপরেখাও তৈরি করতে হবে।

ধানের উৎপাদনশীলতা শুরুর দিকে সেভাবে না বাড়লেও নতুন জাত ও প্রযুক্তির মিথস্ক্রিয়ার ফলে উৎপাদন প্রতি বছরই বাড়ছে। ব্রির পক্ষ থেকে রাইস ভিশন ২০৫০, ডাবলিং রাইস প্রডাক্টিভিটি ২০৩০, ২০৪০ ও ২০৫০ প্রণয়ন করা হয়েছে। যেহেতু দেশে জমির পরিমাণ স্বল্প, তাই এ অল্প জমিতেই উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গবেষণা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন, ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগ প্রতিরোধ, প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করব, কৃষি মন্ত্রণালয় ধানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। মনে রাখা প্রয়োজন, অতীতে একসময় আমাদের ধান সংকটে ভুগতে হয়েছিল। দেশের মানুষের কাছে যেহেতু ভাতের বিকল্প কোনো খাবার এখনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ধানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।