প্রভাবশালী মহলের চাপে ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হয়েছে। ক্রমে আবাসিক এলাকার বিস্তার হওয়ায় নগরের কৃষি ও জলাভূমির অবস্থান বদলে গিয়েছে। যে কারণে শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলজট এমনকি ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটছে বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নগরায়ণের ক্রমবিকাশে স্বাভাবিকভাবেই একটি ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন হয়। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও প্রাণবৈচিত্র্য বজায় রাখায়ও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন, কিন্তু রাজধানী ঢাকার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
আমাদের দেশে রাজধানীকেন্দ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হয়ে যাওয়ায় যেকোনো ক্ষেত্রেই ঢাকা শহরকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। এতে ঢাকা শহরে বসবাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জলাভূমি, খাল-বিল ভরাট করে সেখানে উঁচু বিল্ডিং নির্মাণ শুরু হয়ে যায়। ফলে ভূমির শ্রেণী যেভাবে পরিবর্তন হয় তার ফলে ঢাকা ক্রমেই বসবাসের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে।
এক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের চাহিদার কারণে গত তিন দশকে ভূমির এ শ্রেণী পরিবর্তন হয়েছে। তবে এ পরিবর্তনের বেশির ভাগই অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক উপায়ে হওয়ায় বিরূপ ফল উঠে আসছে।
জানা যায়, ঢাকার কেন্দ্রে অবস্থিত মতিঝিল, গুলশান ও মিরপুরের অনেক এলাকার জলাভূমির শ্রেণী আবাসিকে পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব এলাকার খালসহ কৃষিজমি বিলুপ্ত করে আরবান রেসিডেন্সিয়াল জোন হিসেবে শ্রেণী পরিবর্তন করা হয়েছে। মতিঝিল থানার রাজারবাগে জলাভূমির শ্রেণী পরিবর্তনের কারণ হিসেবে প্রজ্ঞাপনে খালের সংযোগ না থাকার বিষয়টি বলা হয়েছে। অথচ বুড়িগঙ্গা নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা ঢাকা শহর ছিল খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয়ে পূর্ণ এক নগরী। ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় চলতি শতকের শুরুতেও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল নৌ-পথ। ১০ বছর আগেও পূর্বাচল এলাকার স্থানীয় অধিবাসীরা ধানসহ মৌসুমি ফসল চাষাবাদ করতেন। বর্তমানে শুধু ঢাকার ডেমরা ও নাসিরাবাদে এমন দৃশ্য দেখা যাবে। ক্রমে নগরায়ণের ফলে ঢাকার অধিকাংশ কৃষি ও জলাভূমি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন মতে, দিয়াবাড়ী খাল দখল করে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) গড়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, জমিকে খোলা জায়গার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট হিসেবে শ্রেণী পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়া হয়। বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্যই জমির এ শ্রেণী পরিবর্তন করা হয়।
এভাবে ভূমির পরিবর্তনে স্বেচ্ছাচারিতার ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে রাজউকের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আবাসন ব্যবসায়ীদের ব্যবসার প্রসারের বিষয়টিও কারণ হিসেবে গণ্য হয়। রাজউক কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই শহরের শ্রেণী পরিবর্তন করেছে-এ অভিযোগটিও উঠে এসেছে। ফলে তিলোত্তমা নগরী ঢাকার রূপরেখাই বদলে যাওয়ায় অপরিকল্পিত শ্রেণী পরিবর্তন এখন নগরবাসীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা শহরের পরিধি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকার পরিধি একটা সময় ৩২০ একর থাকলেও এখন এটা ১ হাজার ৫২৮ একর হয়েছে। আর অপরিকল্পিত এ নগরায়ণের ফলে কৃষিজমি ও জলাশয় কমে আসার পেছনে সরকারের ভূমির চাহিদার বিষয়টিও ছিল। তবে সর্বশেষ ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) জলাশয় ও কৃষিভূমি সংরক্ষণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকাকে বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিও প্রাধান্য পেয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ এসবের সঙ্গে প্রকৃতির প্রতি বৈরিতার যে যোগসূত্র রয়েছে তা এখন বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত সত্য। আধুনিক সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে গিয়ে প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস করে নগরায়ণের যে প্রসার ঘটছে, এর ফলাফল আমরা তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমেই পাচ্ছি। ঢাকার পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জে ২৬টি খালের মধ্যে শুধু বাবুরাইল খাল রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে সে খালসংশ্লিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি কম রেকর্ড হওয়ার খবর কিছুদিন আগেই প্রকাশ পেল। এর মাধ্যমে খাল বা জলাভূমির যে উপকারিতা সেটিই দৃশ্যমান হয়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকা শহর একটি মন্দ উদাহরণ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিষ্ঠিত। ঢাকা শহরের নদী, খাল-বিল, পুকুর দখল করে যেভাবে স্থাপনা গড়ে উঠেছে, তা ঢাকা শহরের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য নগরায়ণকে দায়ী করলেও পরিকল্পনার অভাবকে অবশ্যই গণ্য করতে হবে।
ইদানীং গ্রামেও পুকুর ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করা হচ্ছে। আর ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে খালের ওপর বাড়ি নির্মাণকে খুব স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে ধরে নেয়া হয়। আগে জলাভূমি বা কৃষিজমি ছিল, সে জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ আধুনিক সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রে জাজ্বল্যমান নিদর্শন হলেও এর ফলে যে ক্ষতিটা হচ্ছে, সেটা কিন্তু অপূরণীয়। অর্থাৎ শুধু আবাসিক এলাকার বিস্তার হচ্ছে এটি দেখতে স্বাভাবিক মনে হলেও চোখজুড়ানো ফসলের খেত বা জলাভূমিতে হালকা ঢেউ খেলা পানির যে কম্পন এসবের নান্দনিক উপযোগিতার চেয়ে বাস্তবিক প্রয়োজনটা বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
পাশের জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জকে সীমিত উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হলেও ঢাকার খালগুলো উদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা কখনোই বিকল্প কোনো কিছু দিয়ে পূরণ করা যাবে না। এক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল উদ্ধারের যে কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে সেটার পাশাপাশি জলাভূমি দখল করে যেন নতুন করে আবাসন তৈরি না করা হয়, সেজন্য রাজউক ও সিটি করপোরেশনের কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন।
কৃষিভূমি বা জলাশয়ে আবাসন নির্মাণ করে বসবাস মূলত দুর্যোগের সঙ্গে বসবাসেরই নামান্তর। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা তো তাদের ব্যবসার চিন্তা করবেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ যদি উদাসীনতা দেখায় তাহলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে। মূলত প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট করা হলে প্রাকৃতিকভাবেই মন্দ ফল দেখা দেয়। এজন্য শহরকেন্দ্রিক যেকোনো পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব কৃষি ও জলাভূমিকে প্রাধান্য দিয়েই একটি শহরের পরিকল্পনা করা হয়। এক্ষেত্রে আসন্ন খাদ্য সংকট এড়াতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক ইঞ্চি জমিও যেন উৎপাদনের বাইরে না থাকে, এমন আহ্বানে সাড়া দেয়ার জন্য হলেও কৃষিজমি রক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য দিতে হবে। কৃষিকাজ শুধু গ্রামেই হবে, নগরায়ণের ফলে তৈরি হয়ে যাওয়া এমন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেরও এখন উপযুক্ত সময়। হয়তো খাদ্য সংকট একটা সময় কেটে যাবে, কিন্তু বসবাসের উপযোগিতা থেকে ঢাকার আর যেন অবনতি না হয় সেটি বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক, সিটি করপোরেশন, ব্যবসায়ীসহ সব দায়িত্বশীল নাগরিকের।