www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ
শিরোনাম:

সরকারি সহায়তা ও কৃষি ঋণের সুফল নিশ্চিতে বড় অন্তরায়


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ২০ ডিসেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ১০:৩৭   কৃষি অর্থনীতি  বিভাগ


কৃষিতে ভর্তুকি থেকে শুরু করে আর্থিক ও কারিগরি সুবিধা দেয়ার জন্য কৃষকের সঠিক ডাটাবেজ থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই কৃষকের পরিপূর্ণ তথ্য নেই। কিছু কিছু মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাছে কৃষকের তথ্য থাকলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ নয়। খোদ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছেই প্রান্তিক কৃষকের সঠিক ডাটাবেজ নেই বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে গতকালের বণিক বার্তায়। সঠিক ডাটাবেজ না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক কৃষকের কৃষিঋণের সুবিধা প্রদান কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝে কৃষকের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সম্পন্ন হয়নি এখনো। ফলে উচ্চমূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক দুর্দিনেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইতিবাচক বিষয় হলো, কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রান্তিক কৃষকের ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। দ্রুতই এ কাজ সম্পন্ন করা দরকার। একই সঙ্গে কৃষকের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে।

করোনা সংকটকালে সবচেয়ে বেশি ভরসা জুগিয়ে গেছে কৃষক, মহামারী, অর্থনৈতিক মন্দা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষককে আহত করলেও কাবু করতে পারেনি। ২০২০-২১ সালে দুই দফার বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আম্পান সামলে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন অনাদিকালের সেই কৃষক। লকডাউনের মধ্যেও যে মানুষ কষ্টে হলেও খেতে পেয়েছে, সেটা তাদেরই কৃতিত্ব। বাংলাদেশে করোনাকালে খাদ্য উৎপাদন বহাল অবস্থায় ছিল, তার কৃতিত্ব বৃহত্তর কৃষক সমাজের। সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন ফসলের ওপর ঋণদান কার্যক্রম হাতে নেয়। তবে বিশেষ করে কিছু ঋণ আছে আবার ভর্তুকি পর্যায়ের। কিছু ঋণ আছে আবার বাণিজ্যিক। ফসলের ঋণ কৃষক ফসল ঘরে তুললেই পরিশোধ করতে হয়। আর বাণিজ্যিক ঋণ প্রথাগত নিয়মেই বিতরণ করে থাকে ব্যাংকগুলো। তবে ভর্তুকি ঋণের হিসাবটা অবশ্যই আলাদা। দেশের স্বার্থে সরকার প্রতি বছর বিশেষ কিছু ফসলের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ বিতরণ করে থাকে। তার মধ্যে মসলা, ডাল এবং দুগ্ধজাত গাভীর জন্য এ ঋণের পদক্ষেপ নেয়া হয়। এক্ষেত্রে প্র্রান্তিক কৃষকের সঠিক তথ্য-উপাত্ত না থাকায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।

ভারতে ই-কৃষি সম্প্রসারণ সেবা চালু করা হয়েছে। কৃষককে সহায়তা দেয়ার জন্য বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষক ডাটাবেজ গড়ে তোলা হয়েছে। এতে করে সরকারের ঋণ ও সহায়তা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে তাদের ব্যয়ও কমেছে। সহায়তার অপচয়ের হারও কমে এসেছে কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ই-কৃষি নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যে যার মতো কাজ করছে। এর কোনো সমন্বয় নেই। মূলত সরকার লোক ভাড়া করে এখন ই-কৃষি সেবা দিচ্ছে। খরচও বেশি। বাংলাদেশে একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাকে (এসও) আড়াই হাজার কৃষি পরিবারকে সহায়তা দিতে হয়, এটা একটা অসম্ভব ব্যাপার। কৃষিসংশ্লিষ্ট আপডেটেড ইনফরমেশনগুলো সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য কৃষকের কাছে যাচ্ছে না। এখন কৃষক শুধু খাওয়ার জন্যই পণ্য উৎপাদন করে না, তার অনেক বাজারসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন। কৃষকের শুধু উৎপাদন উপকরণেরই প্রয়োজন হয় না, তার জীবন ধারণের জন্য অর্থের প্রয়োজন। এর জন্যও পূর্ণাঙ্গ তথ্য-উপাত্ত খুবই জরুরি। দেশের কৃষকসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ দেশের উন্নয়নের মূল স্রোতের বাইরে পড়ে আছে এবং এ শ্রেণীর মানুষের জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। বিশেষ ভর্তুকি ও প্রণোদনার যেসব কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে দেশের ধনী-গরিবের বৈষম্য আরো বেড়েছে, ব্যাংকগুলো বড়দের ঋণ দেয়ায় ব্যস্ত। কেবল কৃষকের জন্য ব্যাংক হিসাব চালু করার মধ্যেই ব্যাংকাররা দায়িত্ব শেষ করেছেন। কৃষির নামে প্রতি বছর যে ঋণ বিতরণ দেখানো হচ্ছে, সেটিও কৃষক পাচ্ছেন কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার।

ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্জনের জন্য ২০১৬ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। এর আওতায় কৃষি বাতায়ন এবং কৃষক বন্ধু ফোনসেবা ৩৩৩১ নামক দুটি ডিজিটাল উদ্ভাবনী উদ্যোগ আছে। এ উদ্যোগের আওতায় ২০১৮ সাল থেকে পাইলট আকারে সারা দেশ থেকে প্রায় ৫৩ লাখ কৃষক ডাটাবেজ সংগ্রহ ও কৃষিসেবার কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের সব কৃষক এবং কৃষি উৎপাদনকে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় আনার উদ্দেশ্য থেকেই এ প্রকল্পের সূচনা হয়েছে। ফলে ডিজিটাল কৃষক প্রোফাইল তৈরি, স্মার্ট কার্ড বিতরণ, ডিজিটাল কৃষি তথ্য বিশ্লেষণ ও তথ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা যাবে। কিন্তু হতাশাজনক বিষয় হলো, প্রকল্পটি এখনো শেষ হয়নি। ফলে কৃষককে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকার কৃষককে কৃষি কার্ড প্রদান করছে, কিন্তু তাদের অবস্থা পরিমাপে কোনো তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।

কৃষকের সচেতনতার অভাব ও বিভিন্ন জটিলতার কারণে কৃষি ঋণের একটি বড় অংশ অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে, কিন্তু বর্তমানের কৃষি অনেক বেশি মূলধননির্ভর। সেচ, সারসহ উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে কৃষিকাজ করতে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন, যা প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে জোগাড় করা কঠিন। উৎপাদনে যার প্রভাব পড়ছে। উচ্চফলনশীল বীজ কেনা থেকে শুরু করে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহারেও অর্থের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কৃষকের জ্ঞানের অভাব ও অর্থায়নের উৎসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় সরকারি সহায়তা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষকের জন্য ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে বিপুল পরিমাণ কৃষকের অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও কে প্রকৃত কৃষক তা চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ঋণ প্রদান করাও সম্ভব হচ্ছে না। ঋণের আবেদন প্রক্রিয়াও গ্রামীণ কৃষকের জন্য বেশ কঠিন। অন্যদিকে এনজিওর মাধ্যমে ঋণ দিতে গেলে সুদের হার অনেক বেড়ে যায়। প্রকৃত কৃষকের জন্য তখন সেই কৃষি ঋণ উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ঋণ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের অবস্থান কৃষি ঋণের সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকের ডাটাবেজ তৈরি করে ঋণ প্রদানকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করবে। ওই ডাটাবেজ অনুযায়ী বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত কৃষক চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ দেবে। ব্যাংকিং সেবাকে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য ঋণের আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করাসহ হাটবাজারে প্রকাশ্যে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এর আগেও এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে সেখান থেকে সুফল মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী যেখানে কৃষির উৎপাদন বাড়াতে কৃষককে নানা সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সেখানে কৃষকের প্রকৃত তালিকা প্রণয়ন জরুরি। দ্রুতই কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। শুধু তালিকা করলেই হবে না, নিয়মিত সেটি হালনাগাদও করতে হবে। প্রান্তিক কৃষকের তালিকা প্রণয়নের সময় কোনো সম্ভ্রান্ত কৃষক অন্তর্ভুক্ত না হন এবং কেউ বাদ না পড়েন, সে দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।




  এ বিভাগের অন্যান্য