www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ
শিরোনাম:

কৃষক পরিবারের ৯১ শতাংশই ক্ষুদ্র


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ২৮ ডিসেম্বর ২০২২, বুধবার, ৯:১৯   কৃষি অর্থনীতি  বিভাগ


প্রাচীনকাল থেকেই দেশের কৃষি খাত টিকিয়ে রেখেছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। বড় পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় বড় ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষক পরিবারগুলো দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। গত ১১ বছরে বড় ও মাঝারি শ্রেণীর কৃষক পরিবারের হার অর্ধেকে নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষক পরিবারগুলোর মধ্যে ৯১ দশমিক ৭ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার।

গতকাল প্রকাশিত কৃষিশুমারি ২০১৯-এর প্রতিবেদনে ৫ শতাংশের বেশি ভূমির মালিক কৃষক পরিবারগুলোকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। ৫ থেকে ২৪৯ শতক জমি রয়েছে এমন পরিবারগুলোকে ক্ষুদ্র, ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক জমি রয়েছে এমন পরিবারগুলোকে মাঝারি এবং ৭৫০ শতকের বেশি জমি রয়েছে এমন পরিবারকে বড় শ্রেণী ধরা হয়েছে। ২০০৮ সালে ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ, যা মোট কৃষক পরিবারের ৮৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০১৯ সালে ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখে। অর্থাত্ পরের ১১ বছরে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ দশমিক ৭ শতাংশে। ২০০৮ সালে মাঝারি পর্যায়ের কৃষক পরিবার ছিল প্রায় সাড়ে ২১ লাখ ৩৬ হাজার বা ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। পরের ১১ বছরে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৩ লাখ বা ৭ দশমিক ৭ শতাংশে। আর ২০০৮ সালে বড় কৃষক পরিবারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার বা ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১ হাজার বা শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশে।

দেশে মোট পরিবার রয়েছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৫২ হাজার ২৯৬টি। এর মধ্যে কৃষক পরিবার রয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৭০ হাজার ৫৩৯টি। আর বাকি ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৭টি পরিবার কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। গত ১১ বছরে পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে কৃষক পরিবারের সংখ্যাও। ২০০৮ সালে মোট পরিবার ছিল ২ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৩টি। এর মধ্যে কৃষক পরিবার ছিল ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩টি।

মূলত বৃহত্ পরিবারগুলো দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। ফলে পারিবারভেদে কৃষিজমির পরিমাণও কমছে। এতে মাঝারি ও বৃহত্ শ্রেণীর কৃষক পরিবারের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, ‘ছোট কৃষক পরিবারের হাতেই এখন দেশের কৃষি। পরিবারগুলো যত ভাঙছে, জমি ততই ক্ষুদ্রাকৃতির হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা। বড় ও মাঝারি কৃষক পরিবার ছোট হচ্ছে। ছোটরা আরো ছোট হচ্ছে। দেশে দিন দিন বাণিজ্যিক কৃষি খামার গড়ে উঠছে। ছোট কৃষক ছোট হতে হতে যখন একেবারেই ভূমিহীন হয়ে যাচ্ছে তখন তারা বাণিজ্যিক কৃষির আওতায় চলে আসছে। দেশের কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে কৃষিতে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। সরকারি পর্যায়ে অর্থাত্ সরকারকে সার ও বীজে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষকরা এখন টাকার জন্য মহাজনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এতে দরিদ্র কৃষক আরো বেশি দরিদ্র হচ্ছে। কৃষকদের যদি আমরা কৃষিকাজে ধরে রাখতে না পারি, তাহলে কিন্তু সামনে আমাদের কৃষি উত্পাদন আরো ব্যাহত হবে।’

শুমারিতে দেখা যায়, গত ১১ বছরে কমেছে নিট আবাদি জমির পরিমাণ। ২০০৮ সালে নিট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৯ একর। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩৪ একরে। তবে এ সময়ে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৪২ শতাংশ বেড়েছে। ২০০৮ সালে ফসলের নিবিড়তা ১৭২ শতাংশ থাকলেও ২০১৯ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২১৪ শতাংশে। অর্থাত্ কৃষি জমিতে গড়ে বছরে দুটির বেশি ফসল আবাদ করছেন কৃষক।

২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে আউশ মৌসুমে ধানের চাষ কিছুটা কমলেও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে আমনের আবাদি জমি। ২০০৮ সালে ৯৩ লাখ ৬১ হাজার একরে আমনের আবাদ হলেও ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৭০ হাজার একরে। আর বোরোর উত্পাদন ১১ বছরে ১ কোটি ১ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ১১ লাখ একরে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আলু, গম, ভুট্টা, পাট ইত্যাদি ফসলের আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে।

এদিকে কমেছে কৃষি মজুর পরিবারের হার। ২০০৮ সালে কৃষি মজুর পরিবারের হার ছিল মোট পরিবারের ৩০ দশমিক ৮২ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা কমে ২৫ দশমিক ৮৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে সংখ্যায় কৃষি মজুর পরিবার এ ১১ বছরে ৮৮ লাখ ৪৪ হাজার ৪০২ থেকে বেড়ে ৯২ লাখ ৮৯৫টিতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সেচনির্ভর জমি এ সময়ে ১ কোটি ১৯ লাখ ৮১ হাজার ৩২৯ থেকে বেড়ে ১ কোটি ২৫ লাখ ৪ হাজার ৩২১ একরে দাঁড়িয়েছে।

কৃষিশুমারিতে বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদিত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির উত্পাদন বাদ দেয়া হলেও গরু উত্পাদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে বড় ধরনের গরমিল দেখা দিয়েছে। কৃষিশুমারিতে ২০১৯ সালে বাণিজ্যিক খামারের গরু ছাড়াই গরুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ ৫২ হাজার। যদিও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক ও বাণিজ্যিক খামার মিলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গরু ছিল ২ কোটি ৪৩ লাখ ৯১ হাজার।

কৃষিশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে গরুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ ৭৮ হাজার। এছাড়া ছাগলের সংখ্যা ১ কোটি ৬৩ লাখ ১৮ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৯৪ লাখ ৪৪ হাজার। মহিষের সংখ্যা ৫ লাখ ৪১ হাজার ১৮৪ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৬টি। মুরগির সংখ্যা ৯ কোটি ৭৮ লাখ ১০ হাজার থেকে ১৯ কোটি ৯৪ লাখ ৩ হাজার এবং হাঁসের সংখ্যা ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৩৩ হাজার থেকে বেড়ে ৭ কোটি ৪৪ লাখ ৯৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের হার বাড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ বাবার যদি বেশি সন্তান থাকে, তাহলে সে জমি তাদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এতে যিনি মাঝারি ছিলেন তিনি ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছেন আবার যিনি বৃহত্ ছিলেন তিনি মাঝারি পর্যায়ে চলে আসছেন। এতে পরিবারের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের হারও বাড়ছে।

ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির বিষয়ে কৃষি সচিব বলেন, ‘আমরা উত্পাদনশীলতার দিকে জোর দিচ্ছি। যেখানে বছরে এক ফসল ছিল সেখানে দুই ফসল এবং যেখানে দুই ফসল ছিল সেখানে তিন ফসল চাষের ওপর জোর দিচ্ছি। অনেক কৃষক তার জমিতে বছরে পাঁচটি ফসলও করছেন। কারণ খাদ্য উত্পাদন বাড়ানো ছাড়া আমাদের বিকল্প নেই। এতে মাটিতে এক ধরনের প্রভাব পড়বে এটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে জৈব উপাদানগুলো কমে যাবে। আমরা প্রত্যেক উপজেলায় সার ব্যবহারের নির্দেশিকা দিয়েছি। মাটির গুণাগুণ কীভাবে ঠিক রাখতে হয় সে বিষয়েও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।’

গতকাল কৃষিশুমারি ২০১৯-এর প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের সময় পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, এবারের কৃষিশুমারিতে পারিবারিক গরু-ছাগল, মোরগ, হাঁস ইত্যাদি গণনা করা হলেও ফার্ম বা বাণিজ্যিকগুলো স্থান পায়নি। এটা ঠিক না। শুমারি হলে সবকিছু এর আওতায় আসা উচিত। এ শুমারি করতে অবশ্যই অনেক অর্থ ব্যয় হয়েছে, অনেক পরিশ্রম হয়েছে। কিন্তু এর ফলাফল সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়। ১৪ বছর আগের তথ্যের সঙ্গে এখন অনেক গরমিল হবে এটা স্বাভাবিক। তবে এটা কারো ইচ্ছাকৃত নয়। এ জরিপ নিয়মিত হওয়া উচিত, অন্তত দুই বছর পরপর। তাহলে এর আউটপুট আরো ভালো হবে। কৃষি আর অর্থনীতি একে অন্যের পরিপূরক।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, অনেকেই প্রশ্ন করছেন কৃষক পরিবার বাড়ল কীভাবে। এটা স্বাভাবিক। কারণ আগে বড় পরিবার ছিল। তাদের জায়গা-জমিও বেশি ছিল। কিন্তু এখন পরিবারগুলো বিভক্ত হয়ে ছোট হচ্ছে। ফলে কৃষক পরিবারের সংখ্যাও বেড়েছে। এ পরিসংখ্যান প্রতি ১০ বছর পরপর হওয়ার কথা থাকলেও কখনো তা হয়নি। এ চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এছাড়া রিপোর্ট হয়ে গেলেও তা প্রকাশ পেতে আরো কয়েক বছর সময় নেয়া হয়। এমনটা হওয়া কাম্য নয়। জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নে এ তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সঠিক সময়ে রিপোর্ট না হলে ১০ বছর আগের তথ্যের সঙ্গে উপসংহার মিলবে না। বিদেশে বা দেশে সব জায়গায় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য সরবরাহ করা হয় এবং এটাই গ্রহণীয়। কাজেই এর তথ্য যথার্থ হওয়া জরুরি।

প্রতিবেদন প্রকাশের অনুষ্ঠানে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন, বিবিএসের মহাপরিচালক মো. মতিয়ার রহমান এবং কৃষি উইংয়ের পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক আলাউদ্দিন আল আজাদ উপস্থিত ছিলেন।




  এ বিভাগের অন্যান্য