
উত্তরের সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রাম। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ এ অঞ্চলে রয়েছে ১৬টি নদ-নদী। আর নদীগুলোর বুকজুড়ে জেগে উঠেছে ছোট-বড় চার শতাধিক চর। যেখানে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের বাস, যাদের প্রধান পেশা কৃষি। তবে দরিদ্র এ জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়তই টিকে থাকতে হয় প্রকৃতির ভাঙা-গড়ার খেলায়। বন্যা ও নদীভাঙনের ফলে প্রতি বছরই এসব চরের অনেক পরিবার হয় গৃহহীন। বিনষ্ট হয় তাদের আরাধ্য ফসল। আবার ভূমি হারিয়ে অনেকেই হয় নিঃস্ব। বন্যা-খরার সঙ্গে বাড়তি দুর্ভোগ যোগ করে শীতের তীব্রতা। ভুগতে হয় নানা রোগ-শোকে। অথচ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এসব মানুষের ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নেয়ারও ব্যবস্থা নেই বেশির ভাগ চরাঞ্চলে। বিশেষ করে জীবনের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হয় গর্ভবতী নারীদের। শিশু কিংবা বৃদ্ধরা অসুস্থ হলেও ভরসা করতে হয় গ্রাম্য কবিরাজের ওপর।
চরের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকেই অবহেলিত কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। ভাঙন, বন্যা, খরাসহ নানা প্রতিকূলতার মাঝে জরাজীর্ণ অবস্থায় বসবাস এ অঞ্চলের লোকজনের। চিকিৎসাসেবা দূরে থাক, সাধারণ রোগের কোনো ওষুধ কিনতে নেই কোনো ফার্মেসিও। তবে বছর কয়েক আগে চার শতাধিক চরাঞ্চলের মধ্যে ৫০টিতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে সরকার। এর মধ্যে নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে ছয়টি কমিউনিটি ক্লিনিক। যেগুলো চালু আছে সেগুলোয়ও মেলে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা ও কিছু সস্তা ওষুধ। বাকি চরগুলোয় আবার এ সুযোগটুকুও নেই। ফলে যেকোনো রোগের চিকিৎসা নিতে চরবাসীকে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় উপজেলা কিংবা জেলা হাসপাতালে। চরগুলোয় যোগাযোগের কোনো সড়ক বা যানবাহন না থাকায় গুরুতর রোগীদের প্রথমে ঘাড়ে করে নিতে হয় নদীর পাড়ে। তারপর দূরত্বভেদে এক-দেড় ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি দিয়ে শহরের কাছাকাছি কোনো ঘাটে নৌকা ভেড়াতে হয়। সেখান থেকে আবার ঘাড়ে করে এক-দেড় কিলোমিটার বালিপথ পাড়ি দিয়ে উঠতে হয় শহরের সড়কে। অবশেষে অটো কিংবা রিকশায় করে যেতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা হাসপাতালে। আর এসব ভোগান্তির কারণে অনেকেই চিকিৎসাসেবা নিতে আসে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় গর্ভবতী নারীদের নিয়ে। নিজস্ব অভিজ্ঞতায় সন্তান প্রসব করানো চরাঞ্চলের ধাত্রীরাই তখন হয়ে ওঠেন প্রসূতিদের ত্রাণকর্তা।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় আষ্টআশির চর। ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা এ চরের সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘ নদীপথ, তারপর কিছুটা সড়ক। প্রথমে নৌকায় করে প্রায় ২ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছতে হয় যাত্রাপুর ঘাটে। সেখান থেকে কিছু পথ হেঁটে ধরতে হয় আট কিলোমিটার দূরের জেলা শহরের অটো। আষ্টআশির চরের বাসিন্দা ময়েজ উদ্দিন জানান, তাদেরসহ পার্শ্ববর্তী অনেক চরেই নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। ফলে কেউ অসুস্থ হলে করার কিছুই থাকে না। আবার যাদের জেলা হাসপাতালে নেয়া হয়, পথের সব ভোগান্তি পার করেই নিতে হয়।
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মসলার চরের বাসিন্দা মোমেনা বেগম। তিনি জানান, তাদেরসহ পার্শ্ববর্তী কোনো চরের গর্ভবতী নারীকেই কখনো হাসপাতালে নেয়া হয়নি। বর্তমানে মসলার চরে কয়েকজন গর্ভবতী রয়েছেন। সময় হলে স্থানীয় ধাত্রী দিয়েই তাদের প্রসব করানো হবে বলে জানান মোমেনা। এমনকি তাতে কোনো জটিলতা দেখা দিলেও করার কিছু থাকে না।
একই অবস্থা সদর ও উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা, মুসার চর, যাদুর চর, দই খাওয়ার চর, রলাকাটা, বড়ুয়া, চিড়া খাওয়া, কালির আলগা, গোয়ালপুড়ী, জাহাজের চর, জাহাজের আলগাসহ রৌমারী, রাজিবপুর, চিলমারী, ফুলবাড়ী ও নাগেশ্বরী উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলগুলোর। স্থানীয়রা জানান, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে মেলে না গ্রাম্য চিকিৎসকও। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুও দিতে পারেন না তারা। যুগের পর যুগ এভাবে চললেও তাদের চিকিৎসায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের ধরলা নদীর অববাহিকার জগমনের চরের বাসিন্দা আক্কাছ আলী জানান, কয়েকদিন আগে তার স্ত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু চরে কোনো চিকিৎসাই দিতে পারেননি। তাই ভাড়া করা নৌকায় প্রথমে রোগীকে ঘাটে নেয়া হয়। পরে সেখান থেকে নদী পার করে অটোতে নেয়া হয় চিকিৎসকের কাছে। আক্কাছ আলী জানান, তাদের জগমনের চরে পাঁচশর মতো পরিবার বসবাস করলেও কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক নেই।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকারচরে স্থাপিত কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোপ্রাইটর মো. মিজানুর রহমান। জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের কমিউনিটি ক্লিনিকে এজন স্বাস্থ্য সহকারী, একজন পরিবারকল্যাণ সহকারী ও একজন কমিউনিটি হেলথ প্রোপ্রাইটর রয়েছেন। সেবা নিতে আসা লোকজনের কথা শুনে তারা মূলত কিছু সাধারণ ওষুধ ও চিকিৎসা পরামর্শ দেন। আর গর্ভবতীদের পেশার পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু এসব ক্লিনিকে প্রসব করানোর কোনো ব্যবস্থা নেই।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. মনজুর-এ-মোর্শেদ বণিক বার্তাকে জানান, জেলার চরাঞ্চলগুলোতে মোট ৫০টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেলেও পার্শ্ববর্তী স্থানে অস্থায়ী ঘরে সেগুলোর কার্যক্রম চলছে। এছাড়া জেলার যেসব চরাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক নেই, সেখানকার বাসিন্দাদেরও চিকিৎসাসেবার আওতায় নিয়ে আসতে কাজ করা হচ্ছে।