www.agribarta.com:: কৃষকের চোখে বাংলাদেশ
শিরোনাম:

চা শ্রমিকদের ৮১ শতাংশই ভুগছেন মাংসপেশির ব্যথায়


 এগ্রিবার্তা ডেস্ক    ১২ নভেম্বর ২০২২, শনিবার, ৫:০৫   সমকালীন কৃষি  বিভাগ


মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক লিপি ভূঁইয়া। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চা পাতা তোলার কাজ করছেন। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টায় শুরু হয় তার কাজ। মাথার সঙ্গে বেল্ট বা দড়ি দিয়ে বাঁধা ঝোলা নিয়ে নেমে পড়েন বাগানে। দুই হাতে পাতা তুলে সেগুলো রাখেন পিঠের ঝোলায়। ১২-১৫ কেজি হলেই পাল্টিয়ে মাথায় বাঁধেন নতুন থলি। সকাল ১০টায় তিনি ২৫-৩০ কেজি চা-পাতা মাথায় নিয়ে প্রায় এক-দেড় কিলোমিটার পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে পৌঁছেন ওজন মাপানোর নির্ধারিত স্থানে। দুপুরে ও বিকালে এভাবে আরো দুদফায় চলে লিপির যুদ্ধ। দীর্ঘক্ষণ বোঝা বহনের ফলে প্রায়ই ভোগেন মাংসপেশির ব্যথায়। কেবল লিপি ভূঁইয়া নন, চা বাগানের প্রায় ৮১ শতাংশ শ্রমিকই এ সমস্যয় ভুগছেন বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুজন গবেষক সম্প্রতি মৌলভীবাজারের একটি চা বাগানের ১৮-৬০ বছর বয়সী ৩৪৬ শ্রমিকের ওপর গবেষণা করেন। এর মধ্যে ২৭৬ নারী ও ৭০ পুরুষ শ্রমিককে প্রশ্ন করা হয়েছিল—এক বছরের মধ্যে তাদের শারীরিক সমস্যা হয়েছে কিনা। তাতে দেখা যায়, ৮০ দশমিক ৯ শতাংশ শ্রমিকই এ সময়ে বিভিন্ন ধরনের মাংসপেশির ব্যথায় ভুগেছেন। আর ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ ভুগেছেন চার মাসের মধ্যে। ‘প্রিভিলেন্স অব ওয়ার্ক রিলেটেড মাসকিউলসকেলিটাল সিম্পটমস এমং টি গার্ডেন ওয়ার্কারস ইন বাংলাদেশ: এ ক্রস সেকশনাল স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (বিএমজে)। নিপসমের ডা. তমাল কান্তি কৈরীর নেতৃত্বে গবেষণায় ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংঘমিত্র দে।


গবেষণায় দেখা যায়, শ্রমিকদের মধ্যে মাংসপেশি ব্যথার কারণে ১৬ দশমিক ১ শতাংশকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে। এছাড়া ৭৮ দশমিক ৩ শতাংশ শ্রমিক নিয়েছেন অসুস্থতাজনিত ছুটি। ১১ দশমিক ৬ শতাংশ তাদের পেশাই বদলে ফেলেছেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যথার কারণে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশের কাজে অবনতি হয়েছে। গবেষকদের ওই প্রতিবেদন বলছে, শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি কাঁধ ও পিঠের ওপরের অংশের ব্যথায় ভোগেন। গবেষণায় অংশ নেয়া ৩৪৬ জনের মধ্যে ২১৯ জন অর্থাৎ ৭৮ দশমিক ২ শতাংশকেই দেখা গিয়েছে কাঁধের ব্যথায় ভুগছেন। আর পিঠের ওপরের অংশের ব্যথা রয়েছে ১৫৭ জন বা ৫৬ দশমিক ১ শতাংশ শ্রমিকের। এছাড়া ৩২ দশমিক ১ শতাংশ ঘাড়, ২০ দশমিক ৭ শতাংশ বাহু, ৩০ শতাংশ কনুই, ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ পিঠের নিচের অংশে, ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ কোমর, ১০ দশমিক ৭ শতাংশ হাঁটু ও ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ভুগছেন গোড়ালির ব্যথায়। অথচ মালয়েশিয়ায় চা পাতা সংগ্রহে প্রযুক্তি ব্যবহার করায় সেখানকার শ্রমিকদের মাংসপেশির ব্যথা একেবারেই কম।

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বেশ কয়েকটি বাগানের চা শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাছ থেকে কুঁড়ি সংগ্রহ, বাগান ছাঁটাই, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, নিরাপত্তারক্ষী—সব দায়িত্বই তাদের কাঁধে। এর মধ্যে পাতা ও কুঁড়ি সংগ্রহকারীদের বেশির ভাগই নারী। প্রতিদিন তাদের তুলতে হয় ২৪ কেজি পাতা। তবেই দৈনিক মজুরি মেলে ১৭০ টাকা। কেউ যদি বেশি তোলেন তখন কেজিপ্রতি বাড়তি দেয়া হয় ৭ টাকা। অভিজ্ঞ শ্রমিকরা অবশ্য দিনে ১০০-১২০ কেজি পাতাও সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলোকে মাথায় কিংবা কাঁধে নিয়ে পাড়ি দিতে হয় পাহাড়ি আঁকাবাঁকা দীর্ঘ পথ। ফলে এসব শ্রমিক প্রায়ই ঘাড়-কোমর ও বিভিন্ন স্থানের মাংসপেশির ব্যথায় ভোগেন। আর যারা নিরাপত্তারক্ষীর দায়িত্ব পালন করেন, তাদের টানা ৮ ঘণ্টা হাঁটাহাঁটিতেই থাকতে হয়। সে কারণে পা ও কোমরের ব্যথায় ভোগেন তারা। ব্যথা বেশি হলে বাগানের হাসপাতাল থেকে নাপা কিংবা ফার্মেসি থেকে ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে পরদিন আবারো কাজে যান। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য অবশ্য বাগানেই হাসপাতাল রয়েছে। তবে শ্রমিকদের অভিযোগ, মাংসপেশির ব্যথা নিয়ে এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গেলে শুধু প্যারাসিটামল দেয়া হয়। বেশি অসুস্থ হলে শরীরে পুশ করা হয় কেবল একটি স্যালাইন।

বুক ও পিঠের ব্যথা নিয়ে গত বুধবার সকালে হাসপাতালে গিয়েছিলেন ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক হিরা ভূমিজ। তাকে দুই বেলা খাওয়ার জন্য দুটো করে প্যারাসিটামল ও হিস্টাসিন দেয়া হয়। হিরা ভূমিজ বলেন, খুব কষ্টের কাজ পাতা তোলা। দিনে তিনবার ২০-২৫ কেজি করে দুই-আড়াই কিলোমিটার উঁচু-নিচু পথ হেঁটে যেতে হয়। বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট উঠে যায়। ব্যথা হয় শরীরের বিভিন্ন স্থানে। প্রায় প্রতিদিনই ওষুধ খেতে হয়। নইলে কাজ করতে পারি না। বাগানের মেডিকেলে গেলে ওষুধ বলতে দেয়া হয় কেবল প্যারাসিটামল ও হিস্টাসিন। তাই বেশি ব্যথা হলে শ্রীমঙ্গলে নিজেদের টাকায় ডাক্তার দেখাই। কোম্পানি থেকে পাঠালে অবশ্য ভিজিট দেয়া লাগে না। বাকি ওষুধপত্র সব নিজের খরচ।

চা শ্রমিক লিপি ভূঁইয়া বলেন, মাথায় রশি বেঁধে কাজ করায় মাথায় ব্যথা হয়। কোমর ও ঘাড় ব্যথা করে। বাগানের হাসপাতাল থেকে শুধু নাপা দেয়। বড় চিকিৎসা দেয় না। তাই দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাই। বড় হাসপাতালে গিয়ে যে চিকিৎসা করাব, তারও উপায় নেই।

বিভিন্ন বাগানের হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য রোগীদের ৮০-৯০ শতাংশই আসেন মাংসপেশির ব্যথা নিয়ে। ভাড়াউড়া চা বাগানের হাসপাতালে গত সোম ও বুধবার দুপুরে গিয়ে অবশ্য কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের এক কর্মী জানান, প্রতিদিন ৩০০ জনের মতো রোগী আসে তাদের ওখানে। এর ৮০ ভাগই বিভিন্ন ব্যথার চিকিৎসা নিতে আসেন। এখানকার চিকিৎসক মূলত প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে হাসপাতালটির চিকিৎসক ডা. আসলামের সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে বলেন, আমাদের এখানে মূলত জ্বর-কাশি, শারীরিক বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা, কাটাছেঁড়া, ভাঙা—এসব সমস্যা নিয়ে আসেন রোগীরা। ভারী কাজ করেন তো তারা, তাই এমন হয়। ব্যথানাশক দিলে কমে যায়। তবে কাজ সম্পর্কিত ব্যথা নিয়ে আসেন ৫-১০ ভাগ। অন্যরা আসেন গাছকাটা বা বিভিন্ন কারণে ব্যথা পেয়ে। আমরা ব্যথানাশক, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন ওষুধ দিই। আবার বড় সমস্যা হলে এক্স-রে করে সিলেট ওসমানী মেডিকেলে পাঠিয়ে দিই।

কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগানের মোট জনসংখ্যা ৫ হাজার ৩৭৯। এর মধ্যে রেজিস্টার্ড শ্রমিক রয়েছেন ১ হাজার ১৫ জন। বাগানের হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১৫০-২০০ শ্রমিক চিকিৎসা নিতে আসেন। সেখানকার চিকিৎসক ডা. সাধন বিকাশ চাকমা বলেন, চিকিৎসা নিতে আসা শ্রমিকদের মধ্যে ৯০ ভাগের বেশি মাংসপেশি ব্যথার কথা জানান। সাধারণত বাহু, ঘাড়, হাত—এসব ব্যথা নিয়ে আসেন তারা। তাদের আমরা পেইনকিলার, ক্যালসিয়াম, গ্যাসট্রিক ও ভিটামিন ওষুধ দিই। দেওরাছড়া চা বাগান হাসপাতালের কম্পাউন্ডার সুদীপ চন্দও জানান, বিভিন্ন ধরনের ব্যথা নিয়ে প্রচুর রোগী আসে তাদের কাছে।

গবেষক দলের প্রধান ডা. তমাল কান্তি কৈরী বণিক বার্তাকে বলেন, মাংসপেশির ব্যথা চা শ্রমিকদের অন্যতম বড় সমস্যা। আমাদের দেশে চা বাগানে হাত দিয়ে পাতা তোলা হয়। অথচ মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। যেটা গাছের ওপর দিয়ে নিলে দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি চলে আসে। এ কারণে তাদের শ্রমিকদের মাংসপেশির ব্যথার হার অনেক কম। তিনি বলেন, আমাদের শ্রমিকরা ১৭০ টাকা মজুরি দিয়ে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেবে নাকি খাওয়া-পরায় খরচ করবে। তাদের পেট চালানোই তো কষ্ট। যুগ যুগ ধরে এসব সমস্যা নিয়েই তাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘স্ট্যাটিস্টিক্যাল হ্যান্ডবুক অন টি ইন্ডাস্ট্রি ২০১৯’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট চা বাগানের সংখ্যা ১৬৬। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলায়ই ৯১টি বাগান রয়েছে। এছাড়া হবিগঞ্জে ২৫, সিলেটে ১৯, চট্টগ্রামে ২১, রাঙ্গামাটিতে দুই, পঞ্চগড়ে সাত ও ঠাকুরগাঁওয়ে রয়েছে একটি বাগান। আর এসব চা বাগানে অনুমোদনপ্রাপ্ত শ্রমিক রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৭৪৭ জন। আর ক্যাজুয়াল শ্রমিক রয়েছে আরো ৩৬ হাজার ৪৩৭ জন।

চা শ্রমিক অধিকারকর্মী মোহন রবি দাস বণিক বার্তাকে বলেন, আমি চীনে চা বাগানে প্রযুক্তিগত ব্যবহার দেখেছি। এ বিষয়ে তত্কালীন চা বোর্ডের পিডিইউ প্রকল্পের পরিচালককে লিখিত প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কুঁড়ি অনেক বেশি সংগ্রহ করা সম্ভব। হ্যান্ড প্ল্যাকিং মেশিনগুলো কিন্তু খুব বেশি দামিও না। দেশেই তৈরি করা সম্ভব। তবে কেন যেন মালিকরা এগুলো করতে চান না। তিনি আরো বলেন, নারীরা যারা কুঁড়ি সংগ্রহ করেন, তাদের হাতে ঘা হয়। বয়স হয়ে গেলে বা অবসরে গেলে হাতের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। আর যারা স্প্রে করেন তাদের কোনো সুরক্ষাসামগ্রী দেয়া হয় না। ফলে এ সেকশনের শ্রমিকরা ফুসফুস ও হার্টের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কম বয়সেই মারা যান। প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে এ ঝুঁকিগুলো থাকত না। আসলে যারা কোম্পানির মালিক তারা চান যে কীভাবে কম খরচ করে বেশি টাকা আয় করা যায়। বিনিয়োগ করতে চান না। ২০১৫ সালে আমরা এগুলো নিয়ে মালিকদের সঙ্গে মিটিংও করেছি, যেন প্রযুক্তির ব্যবহার দেয়া হয়।

তবে মাংসপেশিজনিত সমস্যার বিষয়টি মানতে নারাজ বাংলাদেশী চা সংসদের সিলেট অঞ্চলের সভাপতি ও ভাড়াউড়ার ফিনলে চা বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোহাম্মদ শিবলী।  তিনি বলেন, শ্রমিকরা এসব কাজ করতে অভ্যস্ত। করোনার সময় তারা কেউ অসুস্থ হয়নি। আমি কোনোদিন শুনিনি যে কারো ঘাড় ব্যথা বা অন্য কোনো ব্যথা আছে। ৪০ বছর ধরে আমি বাগানে। অনেকে মিথ্যা রিপোর্ট দেয়। লুকিয়ে তাদের দিয়ে বলানো হয়। আমাদের সামনে ছাড়া কেউ এসে কথা বললে আমরা বিশ্বাস করব না। আমাদের সামনে এসব রিসার্চ করতে হবে। আসলে অনেকে বাইরে থেকে এসে চা শিল্পকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে। আর বেশিদিন থাকবে না চা শিল্প। কেউ তো আর লোকসানে থেকে ব্যবসা চালাবে না। তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য আমাদের চেয়ে কারো বেশি দরদ নেই। এদেশের চা বাগানের শ্রমিকরা যে রকম সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, অন্য কোনো দেশের শ্রমিকরা এত সুস্থ না। আমাদের দেশের নারীরা যে রকম পরিশ্রম করতে পারেন, অন্য কোনো দেশের শ্রমিকরা তা পারবেন না।

প্রযুক্তির ব্যবহার কেন হচ্ছে না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা ব্যবসায়িক ব্যাপার। ব্যবসায় যেটা সুবিধা সেটাই করা হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার আমরাও করি যখন দরকার হয়। শ্রমিক পর্যাপ্ত থাকলে প্রযুক্তির দরকার হয় না। আর দরকার হলে অটোমেটিক আসবে।




  এ বিভাগের অন্যান্য